ইনানীর রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর সামনে এসেছে অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের ঘাটতি; মহাপরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারির দাবি
কক্সবাজারজুড়ে পরিচালিত ছয় শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেছে মাত্র ১২৫টি। পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে মাত্র ৫১টি হোটেল ও রিসোর্ট। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আইন মেনে পরিচালনা এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর জানিয়েছে, অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্টের প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন নেই। গত ১৭ অক্টোবর ইনানীর টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্তে দেখা গেছে, ওই রিসোর্টের ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) কিংবা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অনুমোদনও ছিল না। সেখানে জরুরি বহির্গমন পথ ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ব্যবস্থাও ছিল না।
অধিদপ্তরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি তিনতলা রিসোর্টটি এমনিতেই অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে ছিল। কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন, নিচতলার রান্নার চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অগ্নিনিরাপত্তা ও নিয়ম পরিপালনে ঘাটতি
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চলমান জরিপে জেলাজুড়ে ৬৮৩টি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট, ২৪০টি রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে এবং ১২৭টি বেকারি চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ১২৫টি হোটেল ও রিসোর্ট ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেছে।
গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত অনলাইনে ফায়ার লাইসেন্সের জন্য ৫৩টি আবেদন পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এর মধ্যে ২৩টি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, বাকি ৩০টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন।
কউকের জরিপে জেলায় ৭ লাখ ১ হাজার ৭৪৭টি আবাসিক, অনাবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাও চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৪৫৫টি স্থাপনার অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন রয়েছে। নিরাপদ বহির্গমন পথ রয়েছে ৫ হাজার ৬৯৬টি স্থাপনায়। বাকি স্থাপনাগুলোতে এসব সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, হোটেল মালিকেরা ফায়ার লাইসেন্স নেওয়া ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বাস্তবায়নে বারবার অনীহা দেখিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।
হোটেল ও রিসোর্ট পরিদর্শন এবং নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেছে অধিদপ্তর।
এ ছাড়া নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ফায়ার লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা এবং ভবন চালুর আগেই অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ টিবিএসকে জানান, হোটেল ও রিসোর্ট পরিদর্শন এবং সেগুলোকে লাইসেন্সের আওতায় আনতে ইতিমধ্যে একটি দল গঠন করা হয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও আইনি জটিলতা নিরসনে জেলার জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আইন অনুযায়ী পৌরসভার ভেতরে সমুদ্রতট থেকে ৩০০ মিটার এবং পুরো জেলায় ৫০০ মিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে জমির বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার নির্দিষ্ট কিছু অংশে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকার আইন সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করছে।”
তিনি আরও জানান, অনুমোদনহীন স্থাপনাগুলোকে আইনি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় আনতে এই পরিকল্পনা একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৫১টি হোটেলের
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে—এমন হোটেল ও রিসোর্টের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক।
তিনি বলেন, “পরিবেশ আইন অনুযায়ী, ২০টির বেশি কক্ষবিশিষ্ট স্থাপনাগুলোর নির্মাণকাজের আগে ও পরে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৫১টি প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের এই ছাড়পত্র নিয়েছে।”
তিনি আরও জানান, গত এক বছরে অধিদপ্তর শতাধিক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বিভিন্ন হোটেলের বিরুদ্ধে ৩৩টি নিয়মিত মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান জানান, জেলা প্রশাসনের কাছে হোটেল ও রিসোর্টের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে আনুমানিক সংখ্যা ৬০০-এর মতো। তিনি বলেন, প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করছে।
মহাপরিকল্পনা ও সুস্পষ্ট নীতিমালা চান হোটেল মালিকেরা
কক্সবাজার হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, সরকারি কোনো ডেটাবেস না থাকায় জেলায় ঠিক কতগুলো আবাসিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে কিংবা সেগুলো নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা নিরূপণ করা কঠিন।
টিবিএসকে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। কোনো সরকারি সংস্থার কাছ থেকেই আমি নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান পাইনি।”
কাশেম সিকদার বলেন, একাধিক সংস্থার কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং উপকূলীয় এলাকায় নির্মাণকাজের বিধিনিষেধের কারণে বর্তমান ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “পর্যটন শিল্পের বিকাশ যদি প্রয়োজন হয়, তবে সরকারের উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী আইন সংশোধন করা। আর পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে যদি জমির প্রয়োজন হয়, তাহলে সরকারের উচিত আইনি প্রক্রিয়ায় তা অধিগ্রহণ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া।”
উপকূলীয় পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলো নতুন করে মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে কোন কোন এলাকায় হোটেল পরিচালনা করা যাবে, তা নির্ধারণ করে মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানান।
ঢালাওভাবে হোটেল বন্ধ না করে প্রতিটি ভবন আলাদাভাবে পরিদর্শন এবং নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানান সিকদার।
তিনি বলেন, “প্রতিটি ভবনে কী কী সংস্কার করা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে মালিকদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিন। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ করে তোলা।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, ঢালাওভাবে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলে হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

