বিআইডিএস ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের গবেষণায় তথ্যের গরমিল শনাক্ত, পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা ফেরাতে সরকারের তিন সংস্কার
বিগত সরকারের আমলে নিরূপিত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হিসাবের গুরুতর গলদ ও তথ্যের গরমিল শনাক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, অতীতে যেভাবে জিডিপি নিরূপণ করা হতো, তার নির্ভরযোগ্য বাস্তব ভিত্তি ছিল না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে পরিসংখ্যানকে অসৎ উদ্দেশ্যে হাতিয়ার বা ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
অতীতের তথ্য বিকৃতি ও গরমিল দূর করতে বর্তমান সরকার তিনটি মৌলিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব সংস্কারের মাধ্যমে পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতা, তথ্য সংগ্রহের স্বচ্ছতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও পরিসংখ্যান এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভায় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
এবারের পরিসংখ্যান দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান—টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’।
তথ্যে কারসাজি মানে নিজের সঙ্গে প্রতারণা
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো সরকার তথ্য নিয়ে কারসাজি করলে তা নিজের সঙ্গে প্রতারণা করার এবং নিজেকে নিজে বোকা বানানোর শামিল।
তিনি বলেন, “যে তথ্যের ওপর জনগণের আস্থা থাকে না, সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো কাজ করা বা সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।”
পরিসংখ্যানের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, একটি সরকারের ব্যালেন্স শিটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বা অ্যাসেট হচ্ছে ডেটা। যে সরকার বা গবেষকের কাছে সঠিক তথ্য থাকবে না, তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অতীতের ভুল পর্যালোচনার উদ্দেশ্য দোষ খোঁজা নয়
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অতীতের ভুলভ্রান্তি খতিয়ে দেখার উদ্দেশ্য পূর্ববর্তী সরকারের দোষ-ত্রুটি খোঁজা নয়। বরং সমস্যার গভীরে না পৌঁছালে তার সঠিক সমাধান বা ‘কোর্স কারেকশন’ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, তথ্য সরকারের কাছে সংরক্ষিত থাকলেও এর প্রকৃত মালিক দেশের জনগণ। তথ্য যত বেশি উন্মুক্ত রাখা হবে, তত বেশি জনগণের মতামত ও ফিডব্যাক পাওয়া যাবে। এতে ভুল সংশোধনও সহজ হবে।
তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে যাতে কোনো সংশয় তৈরি না হয়, সে বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও পরিষ্কার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান মন্ত্রী।
তথ্যের বিকৃতি রোধে সরকারের তিন মৌলিক সংস্কার
সভায় জানানো হয়, তথ্যের অসংগতি ও পরিসংখ্যানের মাঠপর্যায়ের জালিয়াতি দূর করতে সরকার বিজ্ঞানসম্মত তিনটি মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করছে।
১. আন্তর্জাতিক মানে জিডিপি নিরূপণ ও জিও-ট্র্যাকিং
সামষ্টিক অর্থনীতি ও জিডিপির হিসাব আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে নিরূপণ করা হবে। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রকৃতপক্ষে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন কি না, তা যাচাই করতে জিও-ডেটা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
২. প্রক্সি-মিনস টেস্টে সুবিধাভোগী নির্বাচন
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভুয়া সুবিধাভোগী শনাক্ত ও বাদ দিতে বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি-মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত নারী ও দরিদ্রদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো এবং জাতীয় সম্পদের অপচয় বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৩. সমন্বিত ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন এবং পপুলেশন রেজিস্টারকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) গড়ে তোলা হবে।
এর মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

