রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে ১০ খাতে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা সাবিনকোর

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ ও ইভি খাতে অগ্রাধিকার; সৌদি আরবের সমপরিমাণ অর্থায়নে সম্মতি এখনো মেলেনি

বাংলাদেশে শিল্প ও উৎপাদনশীল খাতের প্রকল্পে সহায়তা দিতে ১০টি খাতে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে সৌদি-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (সাবিনকো)। অগ্রাধিকার খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ও ইলেকট্রনিকস।

তবে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন মূলত দুই দেশের সরকারের নতুন ইক্যুইটি জোগানের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশ সরকার সাবিনকোতে নতুন সভরেন ইক্যুইটি হিসেবে ১০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ৫০:৫০ মালিকানা কাঠামো বজায় রাখতে সৌদি আরবের কাছেও সমপরিমাণ অর্থ চেয়েছে ঢাকা। তবে সৌদি আরব এখনো অর্থ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়নি।

গত ৭ অক্টোবর পাঠানো এক চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-জাদানকে সমপরিমাণ ১০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন।

দুই দেশের সরকার সম্মত হলে সাবিনকোর পরিশোধিত মূলধন ৬০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৬০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।

সাবিনকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মারুফ উর রহমান মজুমদার টিবিএসকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করেছে। এখন জ্বালানি, ওষুধ ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মূলধন বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। দুই দেশের সরকার নতুন মূলধন জোগানের উদ্যোগ নিলে আমাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।’

সৌরবিদ্যুৎ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ওষুধ খাতে অগ্রাধিকার

সাবিনকোর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের কৌশলপত্র অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ ৪০ মিলিয়ন ডলার সম্ভাব্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ মূলত বড় আকারের ও ক্যাপটিভ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।

পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু অর্থায়নের জন্য আরও ২০ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি), জিরো-লিকুইড-ডিসচার্জ স্থাপনা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং শিল্পকারখানার আধুনিকায়ন প্রকল্প থাকবে।

ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) খাতে ৩০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া শস্য সংরক্ষণ, ডেইরি, পোল্ট্রি, মৎস্য ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামোসহ কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও খাদ্য শিল্পের জন্য আরও ৩০ মিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাকি ৮০ মিলিয়ন ডলার আরও কয়েকটি খাতে ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ইভি ও ব্যাটারি খাতে ১৬ মিলিয়ন ডলার, ইলেকট্রনিকস ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে ১৬ মিলিয়ন ডলার, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোতে ১৪ মিলিয়ন ডলার, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ১২ মিলিয়ন ডলার, পাট ও বহুমুখী পণ্যে ১২ মিলিয়ন ডলার এবং কাগজ, প্যাকেজিং ও রিসাইক্লিং খাতে ১০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তবে এসব বরাদ্দ প্রাথমিক হিসাব। বিনিয়োগ মূলধন যাচাই, ঋণ ঝুঁকি মূল্যায়ন, আইনি বাধ্যবাধকতা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে চূড়ান্ত প্রকল্প নির্বাচন করা হবে।

শিল্প খাতে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে কৌশলপত্রে সৌরবিদ্যুৎকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগ খাদ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ওষুধ খাতে অর্থায়ন দেশে এপিআই উৎপাদন বাড়াতে এবং সৌদি কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

সৌদি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্য

অর্থমন্ত্রীর চিঠিতে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ ও উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে সৌদি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

কৌশলপত্রে প্রস্তাবিত বিনিয়োগগুলোকে সৌদি ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে শক্তিশালী সাবিনকোকে সৌদি কোম্পানিগুলোর জন্য স্থানীয় অর্থায়ন ও যৌথ বিনিয়োগের সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সৌদি প্রতিষ্ঠান আকওয়া পাওয়ার, খাদ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যে আলমারাই এবং শিল্প উৎপাদন খাতে সাবিক-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সম্ভাব্য ক্ষেত্রও চিহ্নিত করা হয়েছে।

সাবিনকো আশা করছে, প্রস্তাবিত ২০০ মিলিয়ন ডলার নতুন মূলধন যুক্ত হলে বহুজাতিক ও আরব উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আরও ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তের ঋণ সংগ্রহ করা যাবে।

উভয় দেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সাপেক্ষে একটি যৌথ সভরেন গ্যারান্টি বা কাউন্টার-গ্যারান্টি কাঠামো গড়ে তোলারও প্রস্তাব করা হয়েছে কৌশলপত্রে।

২০২৯ সালের মধ্যে সম্পদ ৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর প্রাক্কলন

কৌশলগত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাবিনকোর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ১৪.২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

একই সময়ে কর-পরবর্তী বার্ষিক নিট মুনাফা ৩৭.৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৮২ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ পোর্টফোলিও ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এগুলো সম্ভাব্য প্রাক্কলন, নিশ্চিত ফলাফল নয়। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে দুই কিস্তিতে নতুন ইক্যুইটি পাওয়া যাবে—এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই হিসাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উভয় সরকারকে বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার করে জোগান দিতে হবে।

আর্থিক ফলাফল এবং পরিচালনা পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডারদের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে কর-পরবর্তী বার্ষিক নিট মুনাফার ২৫ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণের প্রস্তাব করেছে কোম্পানিটি। এই লভ্যাংশ দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।

প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছর নাগাদ বার্ষিক লভ্যাংশের পরিমাণ ৭০.৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এতে প্রতিটি দেশের সরকার প্রায় ৩৫.২ কোটি টাকা করে পাবে।

তবে এই পুরো সম্প্রসারণ প্রক্রিয়া নির্ভর করছে সৌদি আরবের সমপরিমাণ মূলধন জোগানে সম্মতি, অর্থ ছাড়ের সময় এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর সম্ভাব্যতার ওপর।

পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাবিনকোকে আর্থিক শৃঙ্খলাও বজায় রাখতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন