ইরানের প্রতিরোধক্ষমতার ভুল হিসাব, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও জনঅসন্তোষে দুই নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
প্রান্তকাল । আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণ । ৫ নভেম্বর ২০২৬
ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আট মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যাপক ক্ষতি হলেও তেহরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। ইসরায়েলেও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার কঠিন সমীকরণে পড়েছেন নেতানিয়াহু।
যে ইরানকে দ্রুত দুর্বল করে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর প্রত্যাশা ছিল, সেই দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা এখন দুই নেতার যুদ্ধকৌশল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জিত হয়নি। বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ওয়াশিংটন থেকে তেল আবিব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূচনা হয়। অভিযানে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ধারণা ছিল, শীর্ষ নেতৃত্বের পতন ইরানের ক্ষমতাকাঠামোতে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণের পরও ইরানের রাষ্ট্রীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যায়। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে দেশটি পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতেও চাপ সৃষ্টি হয়।
ইরানের এই সক্ষমতা যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের রাজনৈতিক হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
নেতানিয়াহুর প্রভাবেই কি যুদ্ধে জড়ান ট্রাম্প?
ইরানে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
গত ২৩ মার্চ রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, যৌথ হামলার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগের কথা তুলে ধরেন।
নেতানিয়াহুর মূল্যায়ন ছিল, খামেনিকে সরিয়ে দেওয়া গেলে ইরানের শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। সেই পরিস্থিতি সরকার পরিবর্তনের পথও তৈরি করতে পারে।
তবে ট্রাম্প আগে থেকেই সামরিক অভিযানের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নেতানিয়াহুর বক্তব্য ও গোয়েন্দা তথ্য হামলার সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেললেও সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত দায়িত্ব ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের।
দুই নেতাই নেতানিয়াহুর চাপে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়েছে—এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবুও ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সে বিষয়ে তাঁদের প্রত্যাশা বাস্তবে পূরণ হয়নি।
ইরানের শক্তি বুঝতে কোথায় ভুল হয়েছিল?
ইরান সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। ইসরায়েলের আধুনিক বিমানবাহিনী ও গোয়েন্দা সক্ষমতার তুলনায়ও দেশটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু ইরানের কৌশল ছিল সরাসরি সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পরিবর্তে সংঘাত দীর্ঘায়িত করা এবং প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া।
ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আঞ্চলিক প্রভাব এবং হরমুজ প্রণালির ওপর চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা সেই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি করলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ বন্ধ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
সৌদিভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের সতর্ক করেছেন, রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প সংঘাত কমানোর পরিবর্তে নতুন সামরিক পদক্ষেপও নিতে পারেন। কারণ, ইরান প্রতিরোধ অব্যাহত রেখে বিজয়ের দাবি করলে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষায় ট্রাম্প আবার শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিতে পারেন।
অন্যদিকে আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ইরানের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ওয়াশিংটনের ওপর আলোচনায় ফেরার চাপ বাড়িয়েছে।
যুদ্ধের রাজনৈতিক খেসারত স্বীকার ট্রাম্পের
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। এই ফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের বিষয়টি সামনে এনেছেন।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ মার্কিন ভোটারদের মনোভাবে প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তবে ট্রাম্প যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে ভুল বলে স্বীকার করেননি। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার যুক্তিতে তিনি সামরিক অভিযানের পক্ষেই অবস্থান ধরে রেখেছেন।
এখানে তাঁর রাজনৈতিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যে প্রেসিডেন্ট দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি যুদ্ধ এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর প্রশাসন এখন এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাব নিজ দলের নির্বাচনী অবস্থানেও পড়েছে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি, সামরিক ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
নেতানিয়াহুর মসনদেও অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনীতিতেও নেতানিয়াহুর অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। যদিও বিরোধীরাও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি, ফলে নতুন জোট গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে।
ইসরায়েলের বিরোধী নেতারা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে গিয়ে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সমর্থন ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এবং ইয়ার গোলান মার্কিন নির্বাচনের ফলকে নেতানিয়াহুর পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদি সোমারও মনে করেন, ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত নতুন মার্কিন কংগ্রেস ইসরায়েলের নীতির বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
এতে ইরান যুদ্ধ, সামরিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
রেজিম চেঞ্জের লক্ষ্য অপূর্ণ, সামনে নতুন সংকট
গত ২২ অক্টোবর নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, ইরানের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার পাশাপাশি দেশটির ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনও তাঁর কৌশলগত লক্ষ্য।
কিন্তু আট মাসের বেশি সময় ধরে সংঘাত চলার পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
ইরান ব্যাপক সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হলেও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুই শীর্ষ নেতা নিজেদের দেশের রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করছেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি কঠিন বিকল্প—ইরানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা অথবা নতুন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও জটিল করার ঝুঁকি নেওয়া।
এমিরেটস পলিসি সেন্টারের এবতেসাম আল-কেতবি মনে করেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতা ইরানের সঙ্গে প্রকৃত সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তেহরান যদি এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের অসহায়ত্ব হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে নতুন সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়বে।
ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক হিসাব কতটা ভুল ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের আট মাস পর একটি বাস্তবতা স্পষ্ট—সামরিক আঘাতের মাধ্যমে ইরানের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা গেলেও প্রত্যাশিত রাজনৈতিক পালাবদল ঘটানো যায়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্পের দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং নেতানিয়াহুর জোট সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে সরকার গঠনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
ট্রাম্প এখনো প্রেসিডেন্ট এবং নেতানিয়াহুও অন্তর্বর্তী দায়িত্বে ক্ষমতায় রয়েছেন। তাই তাঁদের ক্ষমতাচ্যুতি নিশ্চিত বলে দাবি করার সুযোগ নেই। তবে উভয়ের রাজনৈতিক অবস্থান যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, তা নির্বাচনী ফলাফলেই প্রতিফলিত হয়েছে।
ইরানে রেজিম চেঞ্জের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত এক অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। তেহরানের শাসনব্যবস্থা টিকে রয়েছে, অথচ ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে।
অন্যের মসনদ বদলাতে গিয়ে নিজেদের মসনদ হারানোর আশঙ্কা—ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর জন্য ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিহাস এখন এটাই।

