বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

শ্রমিক তৌফিক হত্যার বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস: শ্রমমন্ত্রী

কারখানায় ফিরতে শ্রমিকদের আহ্বান, টঙ্গীতে ১০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের সময় গাজীপুরে আহত হয়ে নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সব দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তাঁদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে শ্রমমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শ্রমিকবান্ধব সরকার। যেই ছেলেটা মারা গেছে, তার পরিবারকে আশ্বস্ত করেছি, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অবশ্যই আইনের আওতায় এনে তাদের বিচার করা হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে বলে দেওয়া হয়েছে।’

পোশাকশ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুরের টঙ্গীতে ১০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, হাসপাতালটি বিশেষভাবে শ্রমিকদের জন্য নির্মাণ করা হবে। এ উদ্যোগকে শ্রমিক কল্যাণে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর আগে কোনো সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী সারসংক্ষেপে অনুমোদন দিয়ে সেটি তাঁর কাছে পাঠিয়েছেন।

শ্রমিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, যাদের কল্যাণে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তারা যেন কোনো ধরনের অপপ্রচার বা উসকানিতে বিভ্রান্ত না হন। তাঁর অভিযোগ, একটি পক্ষ দেশের শিল্প খাতকে অস্থিতিশীল এবং পোশাকশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান দুর্বল করে এ খাতের ব্যবসা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবি প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনা ও সমাধানের লক্ষ্যে মজুরি বোর্ডের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শ্রমিক প্রতিনিধি ও মালিকপক্ষের বক্তব্য ও প্রস্তাবের ভিত্তিতে বোর্ডে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমাদের শ্রমিক ভাইদের প্রতি আমি আহ্বান করব, আপনারা কলকারখানায় কালকে ফিরে যান। আপনাদের সমস্ত বিষয়, যেটুকু দাবি করেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে সেই দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই আপনাদের বোর্ড বসছে। বোর্ডে আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ। আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান হবে।’

শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সচল রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শ্রমমন্ত্রী বলেন, সংঘাত ও আন্দোলনের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিক-মালিকের বিরোধ নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এই কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিল্প যদি বাঁচে, আয় বাড়ে। আয় যখন বাড়বে, মজুরিও তখন বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে। তাহলে আপনার মজুরি দিতে তো আপত্তি নাই।’

কারখানা বন্ধ রাখা মালিকদেরও উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেসব মালিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছেন, তাঁদেরও কারখানা খুলে দিয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বিক সহযোগিতার নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। নিরাপত্তার দিক থেকে শুরু করে সব বিষয়ে আমরা আপনাদের পাশে আছি।’

শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষকে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে শিল্পের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে শিল্পকারখানার উন্নয়ন ও উৎপাদন অব্যাহত রাখা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করার কথাও বলেন তিনি।

পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার গাজীপুর মহানগরীর জয়দেবপুর থানার বাহাদুরপুর এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সংঘর্ষের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের লাঠি ও ইটের আঘাতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান পোশাকশ্রমিক তৌফিক শেখ।

পরে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

তৌফিক গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন এবং স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘরিয়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের তবিবর রহমান তবির ছেলে। ছয়ঘরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ২০২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।

বুধবার সকালে ছয়ঘরিয়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক ও স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে তাঁকে দাফন করা হয়।

তৌফিকের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার আশ্বাসের পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথা জানিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিক কল্যাণ, শিল্পের নিরাপত্তা এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন