নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনার পাশাপাশি কর-শুল্ক সুবিধা, স্বল্প সুদের ঋণ এবং বেসরকারি মূলধন আকৃষ্ট করার ওপর জোর
দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা, কার্যকর প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ খাতের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ।
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’-এর সমাপনী দিনে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
বিদ্যুৎ সচিব বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকার আন্তরিক। এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সেমিনারগুলোতে উঠে আসা সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে সরকার।
এক্সপোতে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও উদ্যোক্তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ খাতে এ আয়োজনের মাধ্যমে যে শুভ সূচনা হয়েছে, তা বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেমিনারের আলোচকরা। তাঁদের মতে, এ খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক বিনিয়োগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই স্বল্প সুদের ঋণ, বিকল্প অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
সেমিনারগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর ও শুল্ক-সুবিধা অব্যাহত রাখা, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা এবং সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে দেশি-বিদেশি মূলধন আকৃষ্ট করার সুপারিশ করা হয়।
একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচকদের মতে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে অর্জিত কার্বন ক্রেডিট থেকে আয় করার ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে সরকারি ভবনের ছাদকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুপারিশ উঠে এসেছে এক্সপোর সেমিনারে।
এ জন্য প্রথমে সরকারি ভবনগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি এবং ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের উপযোগিতা যাচাই করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশেষ করে ভবনের ছাদের আয়তন, কাঠামোগত সক্ষমতা এবং সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কারিগরি সম্ভাবনা মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
শিল্পকারখানা ও আবাসিক ভবনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং নীতিগত জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এ ক্ষেত্রে উন্নতমানের সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানির সুযোগ বাড়ানো, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থা আরও সহজ করার সুপারিশ করা হয়।
নেট মিটারিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো গেলে গ্রাহকরা নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ পাবেন। এতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ব্যক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আগ্রহ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবল তৈরি এবং গ্রাহকদের জন্য বিক্রয়োত্তর সেবা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন আলোচকরা।
সেমিনারে আলোচকরা বলেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
তাঁদের মতে, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে এ বিদ্যুতের সংযোগ সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
‘বাংলাদেশের সোলার বিপ্লবের জন্য নীতি, জনশক্তি ও মূলধন’ প্রতিপাদ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজন করে।
‘ছাদের প্রতিটি ইঞ্চি কাজে লাগান, সৌরবিদ্যুৎ থেকে আয় বাড়ান’ প্রতিপাদ্যে গতকাল শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে সৌরবিদ্যুৎ খাতের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়।
এক্সপোর অংশ হিসেবে চারটি বিশেষায়িত সেমিনার আয়োজন করা হয়। এতে সৌরবিদ্যুৎ খাতের নীতিগত পরিবেশ, সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, আবাসিক ও শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং বিনিয়োগের জন্য অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রদর্শনীতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, সোলার মডিউল এবং সংশ্লিষ্ট আধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শন করে। এতে সরকারি সংস্থা, প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা অংশ নেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী, এক্সপোতে ৮০টির বেশি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্যাভিলিয়ন ও স্টল, পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি এবং পাঁচ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক দর্শনার্থীর অংশগ্রহণ ঘটে।
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি, বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা, সহজ অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ কমানো, বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সমাপনী দিনে এক্সপোর স্পনসর ও স্টলে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের পরিবেশবান্ধব গাছ সম্মাননা স্মারক হিসেবে দেওয়া হয়।

