বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের আড়ালে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সরকারের, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংঘাত

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও সংশ্লিষ্ট মহলের বিরুদ্ধে ইন্ধনের অভিযোগ; ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার-আশুলিয়ায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও কারখানা বন্ধ

ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি বিভিন্ন কারখানায় সাময়িক ছুটি ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ।

এদিকে চলমান আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একটি রাজনৈতিক মহল পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে সরকার। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক সহিংসতা সাধারণ শ্রমিক আন্দোলনের অংশ নয়; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা।

তাঁর দাবি, সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে একটি বিশেষ মহল শিল্পাঞ্চলে অরাজকতা সৃষ্টি করছে। শ্রমিক পরিচয়ের আড়ালে বহিরাগত ব্যক্তিরা বিভিন্ন স্থানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে অংশ নিচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, তদন্তে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কিছু কারখানা মালিকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।

পাশাপাশি প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্র পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতে প্রমাণিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাজধানীর মিরপুরসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতা সৃষ্টির অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি।

গোয়েন্দা পুলিশের বরাতে আরও জানানো হয়েছে, অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে লোকজন সংগঠিত করা, সহিংসতার ছবি ও ভিডিও আদান-প্রদান এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন জড়ো করার অভিযোগ করেছে পুলিশ।

রাজধানীর মিরপুরে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ

গত ১ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন সংঘাতময় হয়ে ওঠে।

মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকায় বিক্ষোভ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনের আড়ালে পরিকল্পিত নাশকতার সঙ্গে কারা জড়িত, তা শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

সাভার-আশুলিয়া ও হেমায়েতপুরে একাধিক কারখানা বন্ধ

সাভারের হেমায়েতপুর, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন, আশুলিয়া ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বুধবার হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের তিনটি কারখানা, পদ্মা নেট গার্মেন্টস লিমিটেড, রূপকথা গার্মেন্টস লিমিটেডসহ একাধিক কারখানা আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

দি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স ওভেন লিমিটেডের ৪ নভেম্বরের নোটিশে ৫ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত কারখানা বন্ধ এবং ৮ নভেম্বর কার্যক্রম চালুর কথা জানানো হয়েছে।

এদিকে সাভারে অনুষ্ঠিত এক জরুরি আইনশৃঙ্খলা সভায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ তোলেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। সভায় উপস্থিত বিএনপির নেতারা দলীয় কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে না নিয়ে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জেও অস্থিরতা

দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাকশিল্প এলাকা গাজীপুরেও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

একইভাবে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে।

মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকায় শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ও উৎপাদন কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক ইন্ধনের আশঙ্কা, তবে শ্রমিকদের দাবিও যৌক্তিক

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অভিযোগ করেছেন, পোশাকশিল্পে চলমান সহিংসতার পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অর্থায়ন বা রাজনৈতিক স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও আন্দোলনে স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রকৃত অর্থনৈতিক সংকটও সামনে এসেছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরি দিয়ে পরিবার পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করছেন শ্রমিকেরা।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারাও মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত সহিংসতাকে এক করে দেখা উচিত নয়।

মজুরি বোর্ড গঠন, দ্রুত সমাধানের তাগিদ

চলমান সংকট নিরসনে সরকার ইতিমধ্যে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের লক্ষ্যে কাজ করছে বোর্ড।

তবে শ্রমিকদের একাংশ দ্রুত মজুরি নির্ধারণের নিশ্চয়তা চাইছেন।

অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

তৈরি পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। একাধিক শিল্পাঞ্চলে ধারাবাহিক অস্থিরতা ও উৎপাদন বন্ধ থাকলে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে রাজনৈতিক স্বার্থে শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও উদ্বেগজনক।

একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে কার্যকর সংলাপ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন