অনুসরণ করুন:
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে বড় সংস্কার, একই কাজে থাকবে অভিন্ন দর

নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমিকের মজুরিতে সমন্বিত দরব্যবস্থা, ছয় মাসে সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্য

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নির্ধারণে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকারি সব প্রকৌশল সংস্থার জন্য নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণে অভিন্ন দরব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক দর নির্ধারণ, নিয়মিত দর তফসিল হালনাগাদ এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

একনেকের নির্দেশনায় গঠিত ‘সরকারি ভৌত কাজের দর তফসিল মূল্যায়নপূর্বক পুনর্নির্ধারণ কমিটি’র প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর স্বাক্ষরিত ‘সরকারি ভৌত কাজের দর তফসিল হালনাগাদ ও সংস্কার প্রতিবেদন ২০২৬’-এ সরকারি নির্মাণকাজের ব্যয় নির্ধারণ পদ্ধতিতে এসব পরিবর্তনের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

একই কাজের দর নির্ধারণে অভিন্ন কাঠামো

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি প্রকৌশল সংস্থা নিজস্ব দর তফসিল অনুসরণ করে নির্মাণকাজের ব্যয় প্রাক্কলন করে। এতে একই ধরনের নির্মাণসামগ্রী ও কাজের ক্ষেত্রে সংস্থাভেদে দরের পার্থক্য দেখা দেয়। আবার বাজারদরের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দর তফসিল হালনাগাদ না হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনেও অসংগতি তৈরি হয়।

এ সমস্যা দূর করতে সব সংস্থার জন্য অভিন্ন ভিত্তি দর ও দর বিশ্লেষণের সমন্বিত কাঠামো চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি। পাশাপাশি প্রতিটি নির্মাণ উপকরণ ও কাজের আইটেমের জন্য আলাদা ইউনিক কোড চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে একই কাজের জন্য বিভিন্ন সংস্থার পৃথক দর নির্ধারণের প্রবণতা কমবে এবং ব্যয় প্রাক্কলনে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতি তিন বছর পরপর হালনাগাদ হবে দর তফসিল

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে সাধারণত তিন থেকে চার বছর পরপর দর তফসিল হালনাগাদ করা হয়। ফলে নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর, পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরির পরিবর্তন অনেক সময় সরকারি প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতি তিন বছর পরপর বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দর তফসিল হালনাগাদের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে জ্বালানি, বিদ্যুৎ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে নির্ধারিত সময়ের আগেই দর সমন্বয়ের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

দর নির্ধারণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সফটওয়্যারভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি প্রকৌশল সংস্থাগুলো একই প্ল্যাটফর্মে দরসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার ও সমন্বয় করতে পারবে।

অঞ্চলভেদে আলাদা দর নির্ধারণের প্রস্তাব

দেশের সব এলাকায় নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ও সরবরাহের ব্যয় সমান নয়। বিশেষ করে পার্বত্য, উপকূলীয়, দ্বীপ ও দুর্গম এলাকায় নির্মাণসামগ্রী পৌঁছাতে তুলনামূলক বেশি খরচ হয়। কিন্তু অভিন্ন দর কাঠামোয় এসব এলাকার বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এ কারণে অভিন্ন ভিত্তি দরের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক দরসূচক বা ‘জোনাল ইনডেক্স’ চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি। এর মাধ্যমে ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে নির্মাণকাজের ব্যয় প্রাক্কলন করা যাবে।

আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। এতে প্রিকাস্ট ও প্রিফেব্রিকেটেড নির্মাণসামগ্রী, আধুনিক নির্মাণপদ্ধতি এবং পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ দর তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

শুল্ক-কর ও পরিবহন ব্যয় যৌক্তিক করার তাগিদ

নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার পেছনে শুল্ক-কর, পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থার অনিয়মকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগী আমদানিকারকদের কারসাজি এবং বাজারে কিছু ব্যবসায়ীর একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রড, পাথর ও বিটুমিনের ওপর আরোপিত শুল্ক-কর এবং ঠিকাদারি কাজের ভ্যাট ও কর কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে রডের ক্ষেত্রে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পাথরের ক্ষেত্রে ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক-কর বোঝার কথা উল্লেখ করে এসব বিষয় পুনর্বিবেচনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

পরিবহন ব্যয় কমাতে বালু, পাথর ও বিটুমিনের মতো ভারী নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে সড়কের পাশাপাশি রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন রুটে অবৈধ চাঁদাবাজি ও অনিয়মিত অর্থ আদায় বন্ধে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিটুমিনের আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় রিফাইনারি স্থাপন এবং মধ্যপাড়া গ্রানাইট খনি থেকে উৎপাদিত পাথরের ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

নির্মাণকাজের দায়িত্ব সংস্থাভিত্তিক করার সুপারিশ

সরকারি নির্মাণকাজের দায়িত্ব বণ্টন ও দর নির্ধারণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও সেতুর কাজ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, নদীর তীর সংরক্ষণ ও খাল খননের কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় অবকাঠামোর কাজ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

একইভাবে রেললাইন নির্মাণের দায়িত্ব বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর কাজ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ছয় মাসের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্য

প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যক্রম আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম তিন মাসের মধ্যে অভিন্ন ভিত্তি দর ও দর বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল সংস্থাগুলোকে নিজ নিজ দর তফসিল হালনাগাদ করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলনে সংস্থাভেদে অসংগতি কমবে এবং বাজারদরের সঙ্গে সরকারি দর তফসিলের সামঞ্জস্য বাড়বে। তবে অভিন্ন দর নির্ধারণের পাশাপাশি বাজারদর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অন্যথায় সংস্কারের সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন