দক্ষিণ সিটির ৭৫ ওয়ার্ডে বর্ষাকালীন জরিপে ২,২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে লার্ভা ও পিউপা শনাক্ত; প্লাস্টিকের পাত্র ও জমে থাকা পানিতে বেশি লার্ভা, ঝুঁকিপূর্ণ ২৯ ওয়ার্ড
ঢাকা, ৪ নভেম্বর ২০২৬: নাগরিকরা নিজ নিজ বাসা, আঙিনা ও পানির পাত্রের বিষয়ে সচেতন হলেই এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০.৯ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির ‘বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফলে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বালতি, ড্রাম, বেইজমেন্টে জমে থাকা পানি, মগ ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার নগর ভবন অডিটোরিয়ামে জরিপের ফলাফল প্রকাশ ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা সংক্রান্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
ডিএসসিসি এলাকায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে বর্ষাকালীন লার্ভা শনাক্তকরণ জরিপ পরিচালনা করা হয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১২ দিনব্যাপী এ কার্যক্রম চলে।
সম্পূর্ণ দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়। ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার মোট ৩৬ জন মাঠকর্মী জরিপে অংশ নেন।
সংগৃহীত তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে আধুনিক ‘কবো টুলবক্স’ (KoboToolbox) ব্যবহার করা হয়। জরিপ শেষে ব্রেটো ইনডেক্স (BI), হাউস ইনডেক্স (HI), কন্টেইনার ইনডেক্স (CI) ও পিউপা ইনডেক্স (PI)-এর মাধ্যমে ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। এসব সূচকের ভিত্তিতে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করা হয়।
জরিপের ফলাফলে লার্ভার ঘনত্ব অনুযায়ী ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৯টি ওয়ার্ড: ১, ২, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৫ ও ৭১ নম্বর ওয়ার্ড।
মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ২৮টি ওয়ার্ড: ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৮, ২৩, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪৩, ৪৬, ৫১, ৫২, ৫৭, ৬৪, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭৩ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড।
সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি ওয়ার্ড: ৩, ৭, ১৭, ২৮, ৩৪, ৪১, ৪২, ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৬৩, ৬৬, ৭০, ৭২ ও ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড।
জরিপে পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। বাড়ির ধরন অনুযায়ী লার্ভার উপস্থিতির হার ছিল বহুতল ভবনে ৩১.০৬ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়িতে ৩১.৩৭ শতাংশ, সেমিপাকা বাড়িতে ১৭.৩৯ শতাংশ, খালি প্লটে ৭.১৪ শতাংশ এবং নির্মাণাধীন বাড়িতে ১৩.০৪ শতাংশ।
জরিপে বিভিন্ন পাত্র ও জমে থাকা পানিতে লার্ভার উপস্থিতির হারও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্লাস্টিকের বালতিতে ১৪.২১ শতাংশ, প্লাস্টিকের ড্রামে ১১.২২ শতাংশ, বেইজমেন্টে জমে থাকা পানিতে ৯.৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিকের মগে ৯.২৩ শতাংশ এবং ফুলের টবে ৫.৯৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।
ডিএসসিসির জরিপে এসব পাত্র ও স্থানে লার্ভার উপস্থিতির তথ্য নাগরিকদের নিজ নিজ বাসা ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, নাগরিকদের সচেতনতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়েই ৫০.৯ শতাংশ এডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে সংবাদকর্মীদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। নাগরিক সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গুমুক্ত, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা গড়ে তোলা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রশাসক জানান, জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে বিশেষ মশক নিধন অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া প্রতি শনিবার ডিএসসিসির নিয়মিত ‘ক্লিনিং ডে’ কার্যক্রমের আওতায় শিশুদের ডেঙ্গুর হাত থেকে সুরক্ষায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনা ও টয়লেট পরিষ্কারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জরিপের ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান, সচিব মো. মশিউর রহমান খান, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমানসহ বিভাগীয় ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

