বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ছয় পদক্ষেপের আহ্বান ডব্লিউএইচওর

কার্বন নিঃসরণ কমার পাশাপাশি অর্থনীতিতে আসতে পারে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সুফল

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ছয়টি কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিবছর প্রায় ১৬ লাখ মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক সুফল আসতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক নতুন প্রতিবেদনে এমন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে একই সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষা, পরিবেশের সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ছয়টি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

জেনেভা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, আসন্ন কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা ছয়টি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় কার্যকর স্বাস্থ্য সতর্কতা ব্যবস্থা চালু, জলবায়ু সহনশীল পানীয় জল ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো গড়ে তোলা, হাত পরিষ্কার রাখার অভ্যাস ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, বাসাবাড়িতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে আরও কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ। এসব উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি।

ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিবছর ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়তা করবে।

প্রতিবেদনে এসব উদ্যোগের অর্থনৈতিক সুফলের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পদক্ষেপগুলো থেকে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের রাজস্ব সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মানুষের প্রাণহানি প্রতিরোধ, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত সুফল আসতে পারে।

অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক উদ্যোগ শুধু জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নেই ভূমিকা রাখবে না, বরং রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকেও শক্তিশালী করতে পারে।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘জলবায়ু সংকট মানেই স্বাস্থ্য সংকট। তবে এর কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির বড় অংশই আমাদের হাতে থাকা উপায় ব্যবহার করে প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, পরীক্ষিত ও সাশ্রয়ী পদক্ষেপগুলোর ব্যাপক বাস্তবায়ন লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে, এসব উদ্যোগ থেকে তারাই সবচেয়ে বেশি সুফল পেতে পারে।

তবে প্রতিবেদনের সম্ভাব্য সুফল সম্পর্কে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি জানিয়েছে, গবেষণাটি কয়েকটি উচ্চাভিলাষী পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তারপরও সংস্থাটির মতে, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। তাই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

আসন্ন কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে বিশ্বনেতাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গৃহীত সব ধরনের নীতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কেন্দ্রে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপপ্রবাহ, নিরাপদ পানির সংকট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ফলে জলবায়ু নীতিকে শুধু পরিবেশ রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। সংস্থাটির বার্তা স্পষ্ট—জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় কমানো নয়, প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিপুল ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন