প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ থেকে ৩৫ পয়সা দরে কয়েকটি ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক
ডলারের বিনিময় হার স্বাভাবিক রাখতে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থেকে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কয়েকটি ব্যাংকের কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা দরে এসব ডলার বিক্রি করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আমদানি ব্যয়ের চাপ, জ্বালানি তেল ও এলপিজির বাড়তি দাম এবং রমজান সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার কারণে বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিময় হার স্বাভাবিক রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে।
আমদানি ব্যয়ের চাপে বাড়ছে ডলারের চাহিদা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আরিফ হোসেন খান বলেন, জ্বালানি তেল আমদানিতে বেশি খরচ হচ্ছে। এলপিজির দামও বেশি। রমজান সামনে রেখে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা এলসি খুলছেন। সব মিলিয়ে ডলারের চাহিদা বাড়ায় বিনিময় হার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজার স্বাভাবিক রাখতেই রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করা হচ্ছে।
এর আগে গত সপ্তাহে নিলামের মাধ্যমে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দীর্ঘদিন পর সেটিই ছিল এ ধরনের প্রথম নিলাম। সর্বশেষ নিলামে প্রতিটি ব্যাংককে একক দরপ্রস্তাবে কমপক্ষে পাঁচ লাখ ডলার কেনার জন্য দরপত্র জমা দিতে বলা হয়।
এর আগে গত মঙ্গলবারও ১০ কোটি ডলার বিক্রির জন্য নিলাম আহ্বান করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কয়েকটি ব্যাংক এতে অংশ নিলেও শেষ মুহূর্তে নিলামটি বাতিল করা হয়।
৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে রিজার্ভ নেমেছিল ২৬ বিলিয়নের নিচে
এক দশক আগে রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে উদ্বৃত্ত অর্থ কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে হয়েছিল। তখন রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর সেই অর্থ অলস না রেখে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল আলোচনায়।
কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়ে। বাড়তি আমদানি ব্যয়ের চাপে রিজার্ভ কমতে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে টানা তিন বছর রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ২০২১ সালের আগস্টে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়া রিজার্ভ কমে ২৬ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।
রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ, পরে আবার কেনা শুরু
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভ থেকে এক ডলারও বিক্রি না করার অবস্থান জানান। বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরও একই নীতি বজায় রাখেন।
এ সময় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং বিনিময় হার কমতে শুরু করে। ডলারের দরপতন ঠেকাতে তখন ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে (২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন) সব মিলিয়ে ৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানি ব্যয় কমা, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং ডলার কেনার ফলে রিজার্ভ বাড়তে থাকে। এতে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ সূচক নিয়ে উদ্বেগও কমে আসে।
সর্বশেষ রিজার্ভের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাবপদ্ধতিতে দেশের রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। ওই দিন গ্রস বা মোট রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
পরবর্তী সময়ে রিজার্ভের চিত্র ছিল—
- ৩০ সেপ্টেম্বর: বিপিএম-৬ হিসাবে ৩১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার; গ্রস হিসাবে ৩৬ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলার।
- ৩০ অক্টোবর: বিপিএম-৬ হিসাবে ৩১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার; গ্রস হিসাবে ৩৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার।
- ৪ নভেম্বর: বিপিএম-৬ হিসাবে ৩১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার; গ্রস হিসাবে ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
তবে আগামী সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে। এতে রিজার্ভের পরিমাণ কিছুটা কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির দিকে নজর
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়ের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের পরিস্থিতির উন্নতির আশা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও ডলারের দাম কমেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়তে পারে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তব্যাংক ও খোলাবাজারে ডলারের দর বাড়ছে
কিছুদিন স্থিতিশীল থাকার পর গত কয়েক দিনে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার আবার বাড়তে শুরু করেছে। চলতি সপ্তাহে আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম ১২৪ টাকা ছাড়িয়েছে।
গত দুই দিন ধরে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে। এর আগের দুই দিন এ দর ছিল ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা। মাসের শেষ কার্যদিবসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ টাকা ৯৯ পয়সায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দেড় বছর আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের বিনিময় হার ১২১ টাকা থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে চলতি বছরের মার্চ থেকে ডলারের দর আবার বাড়তে শুরু করে।
ব্যাংকের পাশাপাশি খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটেও ডলারের দাম বেড়েছে। বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মানি এক্সচেঞ্জগুলোতে প্রতি ডলার ১২৮ টাকা ১০ পয়সা দরে বিক্রি হয়েছে। আর কেনা হয়েছে ১২৭ টাকা ১০ পয়সায়।

