বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে ৪.১৭ শতাংশে, বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ

রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে; বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।

বাংলাদেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ছে, স্বস্তি ফিরেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। তবে অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ক্রমেই কমছে। গত সেপ্টেম্বরে এ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য।

আগের মাস আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। টানা সাত মাস ধরে এ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার এ প্রবণতা বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্প সম্প্রসারণে অনীহা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ধারাবাহিক পতন

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। মার্চে তা কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়। এপ্রিল ও মে মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭৫ ও ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এ প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তা সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ হয়। আগস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে আবার কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। গত সেপ্টেম্বরে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ।”

চার বছর আগে, ২০২২ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা বর্তমান প্রবৃদ্ধির তিন গুণেরও বেশি।

বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগেও গতি ফিরছে না

অর্থনীতিকে সক্রিয় করা এবং বন্ধ কলকারখানা চালু করতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করেছে।

তবে এসব উদ্যোগের পরও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়েনি; বরং সেপ্টেম্বরে তা আরও কমেছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা ছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। বাস্তবে তা ওই লক্ষ্যের চেয়ে ১ দশমিক ০৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়ায়।

পরবর্তী ছয় মাসের মুদ্রানীতিতে, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ের জন্য, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করেছে। বর্তমান মুদ্রানীতিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদহারের প্রভাব

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে বিনিয়োগে অনীহা, উচ্চ সুদহার, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ব্যাংকঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের চাহিদাও দুর্বল হয়েছে। ডলারের দাম বেশি থাকায় আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ব্যয়ও বেড়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। এর ফলে ঋণের সুদহার বেড়ে যায় এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির গতি কমতে থাকে।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকারের মেয়াদের সাড়ে আট মাস পার হলেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

পোশাকশিল্পের অস্থিরতায় বাড়ছে উদ্বেগ

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পে মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ, সহিংসতা ও কারখানা বন্ধের ঘটনা ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেশে অনিশ্চয়তা-অস্থিরতা; স্বস্তি নেই। আমরা ভেবেছিলাম নতুন সরকার আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তেমনটা দেখা যাচ্ছে না; উল্টো নতুন নতুন সংকট দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক দিনের পোশাকশিল্পে অস্থিরতায় আমরা উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় বিনিয়োগ করবে কে? ঋণ নেবে কে?”

তিনি আরও বলেন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের দর বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মতো একের পর এক ধাক্কায় দেশের অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ ঋণ সুদহার ও মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

পারভেজের ভাষ্য, দেশে এখন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নেই এবং পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তাও প্রভাব ফেলছে

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধি খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি।

ঋণ প্রবৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি চিত্র

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছর থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এত কম প্রবৃদ্ধি আগে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।

তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ২৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির রেকর্ড হয়।

করোনাভাইরাসের প্রভাবের মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়ায়। পরের অর্থবছরে তা আরও কমে ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আবার বেড়ে ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে।

এরপর থেকে প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ছিল ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।

২০২২ সাল থেকে শুরু নিম্নমুখী প্রবণতা

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয় ২০২২ সালের নভেম্বরে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। তখন করোনা মহামারির পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছিল। এর মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ে এবং ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমতে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জুলাইয়ে তা ১০ দশমিক ১৩ শতাংশে উঠলেও আগস্টে কমে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বরে তা ছিল ৯ দশমিক ২০ শতাংশ, অক্টোবরে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং নভেম্বরে ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৬ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে আসে। মার্চ ও এপ্রিলে সামান্য বেড়ে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৫৭ ও ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হলেও মে মাসে আবার কমে ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ওয়েবসাইটে ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছর থেকে তথ্য থাকলেও এর আগের বছরগুলোতেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৭ শতাংশের বেশি ছিল।

রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়লেও বিনিয়োগে দুর্বলতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে, রেমিট্যান্স বেড়েছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

এ দুই সূচকে ইতিবাচক প্রবণতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও তুলনামূলক স্বস্তি রয়েছে। মঙ্গলবার দিন শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। মোট বা গ্রস হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার।

তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও রিজার্ভ বাড়লেও তা দিয়ে অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে স্বস্তি ফিরে এসেছে—এমনটা বলা যায় না।

তিনি বলেন, “এই অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

জাহিদ হোসেনের মতে, বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন। কারণ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া বিনিয়োগের দুর্বল চাহিদার ইঙ্গিত দেয়, যার প্রভাব নতুন শিল্প স্থাপন, কারখানা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পড়তে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন