সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি বেড়ে ৮৩ শতাংশ: মেটলাইফের গবেষণা

মেটলাইফের গবেষণায় কর্মীদের আর্থিক চাপ ও অবসর প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ; ব্যক্তিগত চাহিদাভিত্তিক সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশাও বেড়েছে।

বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের সন্তুষ্টির হার বেড়েছে। ২০২৬ সালে এ হার দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশে, যা ২০২৫ সালে ছিল ৭৮ শতাংশ। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার কর্মীদের অভিজ্ঞতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে উঠে এসেছে মেটলাইফ বাংলাদেশের এক গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, এআই ব্যবহারকারী ৯১ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, প্রযুক্তিটি তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা উন্নত করেছে।

মেটলাইফ বাংলাদেশের ‘এমপ্লয়ি বেনিফিটস ট্রেন্ডস স্টাডি’ (ইবিটিএস)-এর দ্বিতীয় সংস্করণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, আর্থিক নিরাপত্তা, সুস্থতা এবং কর্মীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতিতে সুযোগ-সুবিধার গুরুত্ব বাড়ছে

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ৮৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা মনে করেন, কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি গঠনে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৭৮ শতাংশ।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে সামগ্রিক সুযোগ-সুবিধা এবং অর্থবহ সহায়তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মীদের চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে পারলে কর্মীদের সম্পৃক্ততা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য এবং ব্যবসায়িক সাফল্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এআই ব্যবহারে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৯১ শতাংশ কর্মী

গবেষণায় অংশ নেওয়া কর্মীদের ৫৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ইতোমধ্যে দৈনন্দিন কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তাঁদের মধ্যে ৯১ শতাংশ বলেছেন, এআই তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে, ৫৮ শতাংশ নিয়োগকর্তা কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছেন বা এর সুযোগ করে দিচ্ছেন। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত কর্মীরা এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করছেন।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মীদের কল্যাণ, আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি পরস্পরের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আর্থিক চাপে কর্মক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার হার বেড়েছে

কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, আর্থিক চাপের কারণে কর্মক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন এমন কর্মীর হার ২০২৫ সালের ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া ৭২ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত আর্থিক সংকট বা ব্যয়ের মুখে পড়লে তাঁরা নিয়োগকর্তার কাছ থেকে সহায়তা প্রত্যাশা করেন।

গবেষণার এ ফলাফল থেকে বোঝা যায়, কর্মীদের আর্থিক চাপ কমানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার ব্যবস্থা রাখা কর্মক্ষেত্রে তাঁদের সুস্থতা ও কাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ব্যক্তিগত চাহিদাভিত্তিক সুবিধার প্রতি আগ্রহ ৮৬ শতাংশ

কর্মীদের ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহও বেড়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, পার্সোনালাইজড বেনিফিটস বা ব্যক্তিগত চাহিদাভিত্তিক সুবিধার প্রতি আগ্রহ ২০২৫ সালের ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিমা ও সুস্থতাবিষয়ক সুবিধাও কর্মীদের আনুগত্যে ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালে ৭৯ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, এসব সুবিধা তাঁদের নিয়োগকর্তার প্রতি আরও অনুগত করে তোলে। আগের বছর এ হার ছিল ৭৮ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, কর্মীদের চাহিদা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুবিধা দেওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়।

অবসর প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অবসর গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের মধ্যে যাঁদের কোনো অবসর পরিকল্পনা নেই, তাঁদের হার ২০২৫ সালের ৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৮১ শতাংশ হয়েছে।

গবেষণার এ তথ্য কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ের আর্থিক প্রস্তুতি এবং অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। কর্মীদের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার গুরুত্বও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

৭০৯ জনের মতামতের ভিত্তিতে গবেষণা

২০২৬ সালে পরিচালিত এ গবেষণায় বিভিন্ন শিল্পের মোট ৭০৯ জন অংশগ্রহণকারীর মতামত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৮৩ জন কর্মী এবং ১২৬ জন নিয়োগকর্তা।

গবেষণায় তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি), ব্যাংকিং, দ্রুত ভোগ্যপণ্য (এফএমসিজি), টেলিযোগাযোগ, খুচরা ব্যবসা, উৎপাদনশিল্প, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাশাপাশি কর্মীদের সহায়তায় গুরুত্ব

গবেষণার ফলাফল সম্পর্কে মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলা আহমদ বলেন, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র মানে কেবল নতুন প্রযুক্তির সংযোজন নয়; কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মীরা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, গবেষণাটি বাংলাদেশে নিয়োগকর্তা ও কর্মী—উভয় পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এর মাধ্যমে তাঁদের পরিবর্তনশীল চাহিদা, প্রত্যাশা এবং নতুন সুযোগগুলো চিহ্নিত করতে সহায়তা পাওয়া যাবে।

আলা আহমদ আরও বলেন, গবেষণার অন্তর্দৃষ্টি নিয়োগকর্তাদের আরও সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে কর্মীদের নিজেদের চাহিদা ভালোভাবে বুঝতে ও তা প্রকাশ করতে সক্ষম করে তুলবে।

তাঁর মতে, প্রযুক্তি, আর্থিক নিরাপত্তা, সুস্থতা এবং প্রাসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাকে সমন্বিত করার মাধ্যমে আরও কর্মোদ্যোগী, প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষম এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতে সহায়তা করা সম্ভব।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন