সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের ইউনিট ৭৬ টাকা, ক্ষুব্ধ দ্বীপবাসীর বয়কটের ঘোষণা

জাতীয় গ্রিডের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি দাম দিয়েও দিনে বিদ্যুৎ মেলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা; সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত স্থানীয়দের।

দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে বেসরকারি উদ্যোগে সরবরাহ করা বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়ে ৭৬ টাকা নির্ধারণ করেছে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড। রোববার (১ নভেম্বর) থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হয়েছে। অথচ স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এত বেশি দাম দিয়েও দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা এবং প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম।

দেশজুড়ে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের নির্ধারিত দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা। সে হিসাবে সেন্টমার্টিনে বাণিজ্যিক বিদ্যুতের দাম জাতীয় পর্যায়ের নির্ধারিত দরের প্রায় পাঁচ গুণ। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্বীপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর দাবি জানিয়েছেন।

৩২ বছর ধরে অচল সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দ্বীপের বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আশির দশকে জেনারেটরভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। দ্বীপের মধ্যভাগে পশ্চিম উত্তরপাড়ায় বাতিঘরের দক্ষিণ পাশে প্রায় পাঁচ একর জমিতে স্থাপিত কেন্দ্রটিতে ছিল দুটি জেনারেটর। সেখান থেকে তখন প্রায় ৬০০ গ্রাহককে সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দেওয়া হতো।

১৯৯৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেঙে পড়ে দেড় শতাধিক বিদ্যুতের খুঁটি, ছিঁড়ে যায় তার। এরপর কেন্দ্রটি আর সচল করা হয়নি। টানা ৩২ বছর ধরে অচল পড়ে আছে সরকারি এই বিদ্যুৎকেন্দ্র।

২০ কোটি টাকায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন

সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল হয়ে পড়ার পর ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দ্বীপের কোনারপাড়া এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়। প্রায় দুই একর জমিতে ৯১৫টি সৌর প্যানেল নিয়ে ২৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড। এতে ব্যয় হয় প্রায় ২০ কোটি টাকা।

বর্তমানে প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রায় এক হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে ১৪০টি হোটেল, ২০টি রেস্তোরাঁ, ৬০০টি বাসাবাড়ি, ১৫৭টি দোকানপাট, ছয়টি সেচপাম্প ও ১৫টি ইজিবাইক চার্জিং পয়েন্ট।

দ্বীপের বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন মূলত এই বেসরকারি প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। তবে পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। বাড়তি চাহিদা মেটাতে জেনারেটর চালানোর খরচের কথা উল্লেখ করে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

আবাসিক গ্রাহকের দাম ৬৫, বাণিজ্যিক গ্রাহকের ৭৬ টাকা

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মূল্যহার অনুযায়ী, সারা দেশে সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ৭৫ ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। পরবর্তী ধাপগুলোতে এ দাম ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। বাণিজ্যিক ও অফিসের গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের নির্ধারিত দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা।

অন্যদিকে, সেন্টমার্টিনে আগে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৬৬ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। ফলে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিটের দাম দাঁড়িয়েছে ৬৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৭৬ টাকা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রকল্প চালুর শুরুর দিকে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। তখন আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ছিল ৩২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৪২ টাকা। ২০২২ সালের জুনে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য পাঁচ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়। এরপর বিদ্যুৎ সরবরাহ কমতে থাকে।

২০২৩ সালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলে ইউনিটপ্রতি দাম আরও ১০ টাকা বাড়ানো হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকদের না জানিয়েই কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে।

রিচার্জের টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ

স্থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিল রিচার্জের সময় বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেওয়া হয়। এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয় বলে দাবি তাঁদের। কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তারও স্পষ্ট হিসাব দেওয়া হয় না। ফলে প্রকৃতপক্ষে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত পড়ছে, তা বুঝতে পারছেন না গ্রাহকেরা।

ব্যবসায়ী মৌলভী আবু তাহের বলেন, বর্তমানে দ্বীপে সৌরবিদ্যুতের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭৪ থেকে ৮২ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এ ব্যয় স্থানীয়দের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অংশ হিসেবে তাঁরাও সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ চান।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, প্রকল্প চালুর প্রথম দুই বছর বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিকমতো পাওয়া গেলেও ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। বাকি সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে।

তিনি বলেন, সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে স্থানীয়রা স্বাগত জানাবেন। কোনো বাসিন্দা কিংবা ব্যবসায়ী ইউনিটপ্রতি ৭৪ টাকা বিদ্যুতের বিল মেনে নেবেন না। প্রয়োজনে দ্বীপে কেবল স্থাপন করে বিদ্যুৎ আনা অথবা ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থারও প্রস্তাব দেন তিনি।

মামলা ও বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণা চেয়ারম্যানের

ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। কিছুদিন আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকেও বাড়তি দামে বিদ্যুৎ নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি চাইলে তাদের বিদ্যুৎ নিয়ে যেতে পারে। দ্বীপবাসীর সুবিধার্থে সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

ফয়েজুল ইসলাম আরও বলেন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মঙ্গলবার স্থানীয় বাসিন্দা ও অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক হবে। বৈঠকের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দ্বীপবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণাও দেন।

দাম বাড়ানোর কারণ জানাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান

ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সেন্টমার্টিন কার্যালয়ের প্রকৌশলী মোহাম্মদ শিহাব বলেন, প্রকল্পটি স্থাপনের সময় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কম ছিল। এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল শুরু হওয়ায় চাহিদা বেড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

তিনি জানান, পর্যটন মৌসুমে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার মো. রফিকুল ইসলাম সোমবার বিকেলে বলেন, প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।

দাম বাড়ানোর বিষয়ে অবগত নয় উপজেলা প্রশাসন

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে কিছু জানানো হয়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দাম বাড়ানো হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল। বিষয়টি প্রশাসন দেখছে বলে জানান তিনি।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন