সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ৫০০–৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কমাতে চায় টিসিবি

ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা; চার থেকে পাঁচ বছরে আর্থিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্য, ভর্তুকির পণ্যের দাম বাড়ছে না

সরকারি ভর্তুকির ব্যয় কমাতে ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির ব্যয় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে বিদ্যমান ভর্তুকির পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বাসসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পণ্য কেনার খরচ, ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়িয়ে আর্থিক সক্ষমতা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত অর্থবছরে ভর্তুকি ব্যয় ২ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা

২০২৫–২৬ অর্থবছরে টিসিবির ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পণ্য কেনা ও বিক্রির দামের পার্থক্য এবং ব্যাংকঋণের সুদ—ভর্তুকির বড় দুটি উৎস।

টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, যে দামে পণ্য কেনা হয়, তার চেয়ে অনেক কম দামে উপকারভোগীদের কাছে তা বিক্রি করতে হয়। কিছু পণ্য কেনা দামের তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কম দামে বিক্রি করা হয়। এসব পণ্যের মধ্যে ভোজ্যতেলে ভর্তুকির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।

তিনি জানান, ২০২২ সাল থেকে টিসিবি প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১০০ টাকায় বিক্রি করছে। বর্তমানে ডিলার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়সহ প্রতি লিটার তেল কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণের সুদ যোগ হলে খরচ প্রায় ২০০ টাকায় দাঁড়ায়।

নগদে পণ্য কিনে ঋণের সুদ সাশ্রয়

ব্যাংকঋণের সুদ কমাতে ঋণপত্র (এলসি) ও ঋণপত্রের বিপরীতে ঋণ (এলটিআর) সুবিধার পরিবর্তে নগদ অর্থে চিনি ও মসুর ডাল কেনা শুরু করেছে টিসিবি।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এ উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ প্রায় ১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে নগদ অর্থে চিনি ও মসুর ডাল কেনায় এলসি চার্জ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় কমেছে প্রায় ৪২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

টিসিবির চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে সংস্থাটির বার্ষিক ব্যাংকঋণের সুদ ব্যয় প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। এ ব্যয় থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ঋণপত্র খোলা এবং ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা কমানো হচ্ছে। যেখানে সম্ভব, নগদ অর্থে পণ্য কেনা হচ্ছে।

এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ কম সুদে ঋণসুবিধা পাওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলা ও এলটিআর সুবিধা নেওয়া শুরু করেছে টিসিবি।

বিক্রির অর্থ দ্রুত জমায় চালু হয়েছে এপিআই

পণ্য বিক্রির অর্থ দ্রুত টিসিবির ব্যাংক হিসাবে জমা নিশ্চিত করতে একটি অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) চালু করেছে সংস্থাটি।

আগে বিক্রির অর্থ জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) হিসাবের মাধ্যমে টিসিবির কাছে আসত। নতুন ব্যবস্থায় ডিলারদের কাছ থেকে বিক্রির অর্থ দ্রুত সংস্থাটির ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করে নগদে পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে টিসিবি।

সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণ বিক্রি করে মুনাফা

ভর্তুকির পণ্যের বাইরে আয় বাড়াতে সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বাজারে এনেছে টিসিবি। এসব পণ্য প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হলেও কেনা দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি।

আয় বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে চেয়ারম্যান ফয়সল আজাদ বলেন, শুধু ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব নয়; একই সঙ্গে আয়ও বাড়াতে হবে।

বিতরণ ও জরিপের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ

পরিবহন, পণ্য ওঠানো-নামানোসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় কমাতে পণ্য বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে টিসিবি। আগে আঞ্চলিক গুদাম থেকে পণ্য জেলা প্রশাসনের গুদামে পাঠানো হতো। এখন আঞ্চলিক গুদাম থেকেই সরাসরি পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এ ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।

এ ছাড়া জরিপের কাজে পুনরাবৃত্তি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিসিবির চেয়ারম্যান জানান, জরিপ ও এ-সংক্রান্ত কাজে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। একই ধরনের জরিপের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা গেলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।

উপকারভোগী বাড়ানোর লক্ষ্য ৮০ লাখে

ব্যয় কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি টিসিবির পণ্য কেনার সুযোগ পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত পণ্যসহ সংস্থাটির কার্যক্রমের আওতায় প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ পণ্য কিনছেন। চলতি অর্থবছরে এ সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

ফয়সল আজাদ বলেন, চলতি বছর ৮০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে আগামী অর্থবছরে এক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর আশা করছেন তাঁরা।

তবে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লে সংস্থার মোট ভর্তুকির প্রয়োজনও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন টিসিবির চেয়ারম্যান।

ভর্তুকির পণ্যের দাম অপরিবর্তিত থাকবে

বিদ্যমান ভর্তুকির পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন ফয়সল আজাদ। তিনি বলেন, এসব পণ্য আগের দামেই বিক্রি করা হবে।

নতুন বাণিজ্যিক পণ্য যুক্ত করা হলেও সেগুলো উপকারভোগীদের জন্য বাধ্যতামূলক হবে না। উপকারভোগীরা চাইলে এসব পণ্য কিনতে পারবেন; কেনার জন্য কাউকে বাধ্য করা হবে না।

টিসিবির চেয়ারম্যানের আশা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানো এবং সামগ্রিক দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে ধীরে ধীরে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন