মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

পোশাক খাতে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে ক্রয়াদেশ কমাতে পারেন বিদেশি ক্রেতারা

সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো; পরিস্থিতি না বদলালে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা রপ্তানিকারকদের।

তৈরি পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে পারেন বিদেশি ক্রেতারা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কারখানা মালিকদের কাছে উৎপাদন পরিস্থিতি ও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চাইছে তারা।

কারখানা মালিক ও ক্রেতাদের প্রতিনিধিরা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানিয়েছেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারার ঝুঁকি নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্রয়াদেশ কমানো বা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দুই মাসের ক্রয়াদেশ কমানোর ভাবনা

তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনছে—সুইডেনভিত্তিক এমন একটি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকা কার্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আগামী দুই মাসের জন্য ক্রয়াদেশ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে তাদের প্রতিষ্ঠান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি টিবিএসকে বলেন, “এই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমাদের পক্ষ থেকে তেমন সমস্যা নেই। তবে এটি যদি দীর্ঘায়িত হয়, সেক্ষেত্রে পরবর্তী দুই মাসের জন্য ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।”

অন্য এক ক্রেতা প্রতিনিধি জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের জন্য পোশাক তৈরি করে—এমন কয়েকটি কারখানায় ইতিমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। চালু থাকা কারখানাগুলোতেও অন্য কারখানার শ্রমিকদের হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

আরেকটি ব্র্যান্ডের প্রসঙ্গ তুলে ওই প্রতিনিধি বলেন, যেসব কারখানা নিয়মিত তাদের পণ্য সরবরাহ করে, চলমান অচলাবস্থায় সেগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শিপমেন্টে দেরি হওয়ায় অসন্তোষ ক্রেতাদের

ফেব্রিকা নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পণ্য পাঠাতে দেরি হওয়ায় ক্রেতারা ইতিমধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন।

টিবিএসকে তিনি বলেন, “সঠিক সময়ে উৎপাদন করতে না পারায় শিপমেন্টের সময় বাড়ানোর জন্য বলা হলে ক্রেতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।”

মিজানুর রহমান আরও জানান, কিছু ক্রেতা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া বন্ধ রেখে সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে তিনি খবর পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ধীরে ধীরে কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, পোশাক খাত এমনিতেই জ্বালানি সংকট, মজুরি বৃদ্ধির চাপ ও ক্রয়াদেশের ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে ক্রয়াদেশ বাতিল বা কমে গেলে আসন্ন রমজান ও ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব বোনাস পরিশোধ করা কারখানাগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

মিজানুর রহমানের মতে, চলমান আন্দোলন কেবল ন্যূনতম মজুরির দাবিতে হচ্ছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা-ও বোঝার চেষ্টা করছেন বিদেশি ক্রেতারা।

দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শেহাব উদ্দোজা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হতে পারে, তা জানতে চেয়ে সোমবার এক ক্রেতা প্রতিনিধি তাঁর কারখানায় যোগাযোগ করেছেন।

টিবিএসকে তিনি বলেন, “আমরা আশঙ্কা করছি, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বাংলাদেশ ক্রয়াদেশ হারাবে।”

খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা না গেলে ক্রেতারা ছাড় দাবি করতে পারেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো ক্রয়াদেশ বাতিলও হয়ে যেতে পারে।

পাঁচ শতাধিক থেকে প্রায় ৭০০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারের সমান। শ্রমিক প্রতিনিধিরা প্রায় এক মাস ধরে এই মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছেন তাঁরা।

শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় রোববার ৫০০টিরও বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকেরা। ওই দিন সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করায় সোমবার কারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে আরও নাজুক হয়।

সোমবার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় এবং হামলার আশঙ্কায় মালিকপক্ষ প্রায় ৭০০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখে। এতে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের স্বাভাবিক সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিমানপথে পণ্য পাঠালে বাড়বে পরিবহন ব্যয়

নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে রপ্তানিকারকদের উড়োজাহাজে পণ্য পাঠানোর বিকল্প বিবেচনা করতে হতে পারে। তবে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ স্বাভাবিক সমুদ্রপথের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।

ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকা বা দেরিতে চালু হওয়ার কারণে শুধু ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিই নয়, রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে ছাড় দেওয়া, অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা কিংবা ক্রয়াদেশ বাতিলের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন তাঁরা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন