রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির শিডিউল চূড়ান্ত করছে সরকার

চুক্তিবদ্ধ ৪০ কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করবে কাতারএনার্জি; দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে অনিশ্চয়তায় আপাতত পুরো বছরের পরিকল্পনা স্থগিত।

২০২৭ সালে বাংলাদেশের জন্য চুক্তিবদ্ধ ৪০টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করবে কাতারএনার্জি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বার্ষিক প্রতিশ্রুতির ৬৫ শতাংশ পূরণ করবে। এদিকে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে গ্যাস পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আপাতত আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির শিডিউল চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

মার্চ পর্যন্ত আমদানি সূচি তৈরির নির্দেশ

কর্মকর্তারা জানান, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পুরো বছরের শিডিউল চূড়ান্ত না করে আপাতত ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এলএনজি আমদানির সরবরাহ সূচি প্রস্তুত করতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এলএনজিবাহী জাহাজের যাতায়াত বাড়বে এবং সরবরাহকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা হলে সরবরাহের অচলাবস্থা কাটতে পারে। এতে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত কার্গো নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে। এ প্রত্যাশা থেকেই পুরো বছরের সরবরাহ পরিকল্পনায় আবদ্ধ না থেকে আমদানি সূচি নমনীয় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর এ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সংঘাতের কারণে এলএনজি উৎপাদন ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। কয়েকটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চুক্তিবদ্ধ ১২৮ কার্গোর মধ্যে নিশ্চিত ৭১টি

বাংলাদেশ শুরুতে ২০২৭ সালে প্রায় ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে অন্তত ১০৩টি কার্গো দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আসার কথা ছিল। তবে চুক্তিবদ্ধ মোট ১২৮টি কার্গোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭১টির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা।

কাতারএনার্জি সরবরাহ করবে ২৬ কার্গো

বাংলাদেশের বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ২০২৭ সালে চুক্তিবদ্ধ ৪০টি কার্গোর মধ্যে ২৬টি সরবরাহ করবে। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী সংস্থা কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি চুক্তিবদ্ধ ২৪টির বিপরীতে আরও ১৮টি কার্গো সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান দুটির সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়াবে মোট ৪৪টি কার্গো।

নিজেদের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পর কাতারএনার্জি ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করায় সরবরাহ কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও চুক্তি অনুযায়ী ২০২৭ সালে পুরো ৪০টি কার্গো পাওয়ার আশা করেছিল বাংলাদেশ।

ওমানের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওকিউ ট্রেডিংয়ের (ওকিউটি) ওপরও। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৭ সালে বাংলাদেশে ৩২টি কার্গো সরবরাহের কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত একটি কার্গোর সরবরাহও নিশ্চিত করেনি।

ওকিউটি তাদের চুক্তিবদ্ধ প্রতিশ্রুতির অর্ধেক, অর্থাৎ ১৬টি কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি ব্রেন্ট ক্রুড তেলনির্ভর বর্তমান মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর পরিবর্তে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) অনুযায়ী দাম নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম হবে জেকেএম সূচকের চেয়ে ০.০৪ ডলার কম।

পেট্রোবাংলা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে প্রতিষ্ঠানটিকে বিদ্যমান চুক্তির শর্ত মেনে চলতে বলেছে। গত মার্চে সরবরাহ সংকট শুরুর পর থেকে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ দেখিয়ে এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রেখেছে ওকিউটি।

গানভর ও টোটালএনার্জিস দেবে ১৮ কার্গো

২০২৬ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে ১১৭টি কার্গো সরবরাহের লক্ষ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ১৩ বছর মেয়াদি এলএনজি চুক্তির আওতায় ২০২৭ সালে গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে ছয়টি কার্গো পাবে বাংলাদেশ।

এই ছয় কার্গোর প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়বে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৮৭৫ ডলার। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে জেকেএম সূচকের ভিত্তিতে মোট ১৪টি কার্গো সরবরাহ করবে গানভর। এর মধ্যে ২০২৬ সালে পাঁচটি, ২০২৭ সালে ছয়টি এবং ২০২৮ সালে তিনটি কার্গো আসবে।

বাকি ১০৩টি কার্গো সরবরাহ করা হবে ২০২৮ থেকে ২০৩৮ সালের মধ্যে। এগুলোর প্রতি এমএমবিটিইউর দাম নির্ধারণ করা হবে যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি হাব সূচকের ১২১ শতাংশের সঙ্গে ৫.২০ ডলার যোগ করে।

ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিস ২০২৭ সালে ১২টি কার্গো সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১৮টি কার্গো সরবরাহের লক্ষ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এসব গ্যাস আসবে। এতে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়বে জেকেএম সূচকের সঙ্গে অতিরিক্ত ০.০৬ ডলার।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এক্সেলেরেট গ্যাস ২০২৭ সালের নির্ধারিত ১৪টি কার্গোর মধ্যে নয়টির সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।

রিগ্যাসিফিকেশনের পর প্রতিটি এলএনজি কার্গো থেকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায়।

এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে আর্থিক চাপ

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অস্থির স্পট মার্কেটের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে গিয়ে সরকার যে বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে, এ ব্যয় তারই প্রতিফলন।

এ পরিস্থিতিতে আপাতত শুধু আগামী মার্চ পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহের শিডিউল প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পেট্রোবাংলা সরবরাহের প্রতিশ্রুতি ও ক্রয়চাহিদা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পাবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন