সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ, সহজ সনদ ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের তাগিদ অংশীজনদের
বিশ্বজুড়ে ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল অর্থনীতির বাজারে বড় অংশীদার হওয়ার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, হালাল সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন শিল্প খাতের অংশীজনেরা।
তাঁরা জানান, বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী ও শক্তিশালী উৎপাদনব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি করেছে। তাঁদের মতে, এ খাতে দেশের প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ এখনও কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীতে আয়োজিত ‘ইনভেস্টরস মিটআপ ৩.০’ শীর্ষক বাণিজ্য সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), লেদার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহযোগিতায় বিডিফেয়ার্স ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল ঢাকা অ্যাচিভার্স যৌথভাবে সম্মেলনটির আয়োজন করে।
বৈশ্বিক বাজার ২০৩৪ সালে ১২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মো. মোমিনুল ইসলাম জানান, দিনার স্ট্যান্ডার্ডের ‘গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির বাজারমূল্য ছিল ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রায় ১৯০ কোটি মুসলিম ভোক্তার চাহিদার ওপর নির্ভর করে বাজারটি বছরে ৬ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০৩৪ সাল নাগাদ এর আকার ১২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ খাদ্য খাতের, যার মূল্য ৩ দশমিক ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে ফ্যাশন খাতের ১ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন, পর্যটনের ১ দশমিক ৩০ ট্রিলিয়ন, ওষুধশিল্পের ১ দশমিক ২৪ ট্রিলিয়ন এবং প্রসাধনসামগ্রীর ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের বাজার।
মোমিনুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে ৮০২টি হালাল প্রত্যয়িত পণ্য এবং ৩০১টি প্রত্যয়িত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলিম হওয়ায় বাংলাদেশের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য হতে পারে।
হালাল শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি
বক্তারা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ‘হালাল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব বাংলাদেশ’ (হিডাপ) নামে একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তাঁদের মতে, একটি একক কর্তৃপক্ষ গঠন করা হলে এ খাতের উন্নয়ন সমন্বয়, নীতিমালা প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সহজ হবে।
মোমিনুল ইসলাম হালাল কৃষিপ্রযুক্তি, প্রিমিয়াম বীজ, অর্গানিক চাল এবং হালাল লজিস্টিকস অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন। এ ছাড়া গুদামজাতকরণ, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, কোল্ড চেইন সুবিধা ও বন্দরের সমন্বয়ে কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
সামুদ্রিক মাছের উপজাত থেকে খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রীতে ব্যবহারের উপযোগী হালাল জেলাটিন উৎপাদন এবং মুক্তা চাষের মাধ্যমে ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর কথাও বলেন তিনি। বিনিয়োগ আকর্ষণে মুদারাবা, মুশারাকা ও সুকুকের মতো ইসলামি অর্থায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন মোমিনুল।
সহজ করতে হবে হালাল সনদ প্রদান প্রক্রিয়া
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, কৃষি, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি—বাংলাদেশের অর্থনীতির এই তিনটি প্রধান স্তম্ভ বর্তমানে স্থবিরতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে শিল্পে অটোমেশন বাড়ায় পোশাক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও কমে আসছে।
তিনি বলেন, সরকারি সমন্বয় জোরদার এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ হালাল শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে।
পারভেজ বলেন, এ জন্য অতিরিক্ত গ্যাস-বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই। দেশে যেসব পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, সেগুলো হালাল মানদণ্ড মেনে তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর সনদব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বিশ্ববাজারে আরও বেশি পণ্য রপ্তানি সম্ভব হবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের হালাল সনদ বিভাগের প্রধান এ কে এম বদরুল আহসান জানান, সংস্থাটি ২০০৫ সাল থেকে হালাল সনদ দিয়ে আসছে। তবে তাদের নিজস্ব কোনো পরীক্ষাগার নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও নির্ধারিত কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে সনদ দেওয়া হয়। পণ্যের মান পরীক্ষায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষাগার ব্যবহার করা হয়।
তিনি জানান, প্রত্যয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পাঁচ থেকে ছয়টি দল কারখানা পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের পর সংশ্লিষ্ট কমিটি চূড়ান্ত সনদ অনুমোদন করে।
বদরুল আহসান বলেন, ২০২৩ সালে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় হালাল সনদসংক্রান্ত দায়িত্ব ও কাজের পরিধি নির্ধারণ করা হয়। সরকারের অনুমোদিত কার্যবণ্টন বিধি অনুযায়ী হালাল মান নির্ধারণ ও সনদ দেওয়ার মূল দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ওপর ন্যস্ত।
তবে শুধু সনদ প্রদান করলেই এ শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নও জরুরি। সব অংশীজনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমন্বিত হালাল প্রতিষ্ঠান বা স্বতন্ত্র বিভাগ চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
চামড়া রপ্তানিতে উৎস শনাক্তকরণ ও ট্র্যাকিংয়ের ঘাটতি
চামড়া খাতের রপ্তানিকারকেরা জানান, পশুর উৎস শনাক্তকরণ এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছ ট্র্যাকিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত চামড়ার জন্য আন্তর্জাতিক হালাল সনদ পেতে সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘বেনে’র স্বত্বাধিকারী শামীমা আক্তার কেয়া বলেন, চামড়াজাত পণ্যের হালাল সনদ পেতে আন্তর্জাতিক সনদ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ পশুর উৎস ও পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য চায়। কিন্তু এসব তথ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা দেশে নেই।
তিনি বলেন, কোথায় গবাদিপশু জবাই হচ্ছে এবং হালাল পদ্ধতি অনুসরণ করে চামড়া সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করার মতো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এ জন্য কসাইখানা থেকে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র পর্যন্ত একটি কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান তিনি।
রপ্তানিকারকদের মতে, দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পশু জবাই হলেও সুনির্দিষ্ট নজরদারি ও প্রত্যয়ন কাঠামোর অভাবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে স্থানীয় চামড়ার হালাল গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করা কঠিন হচ্ছে।
টেকসই শিল্পায়নে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের তাগিদ
সম্মেলনের ‘টেকসই শিল্প এবং ইএসজি বিনিয়োগ’ শীর্ষক আরেক অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনসিএল, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং জাপানের জাইকা/এপিওর পরামর্শক প্রকৌশলী এ ফাত্তাহ আসিফ। তিনি শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারিচালিত সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর মতো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রমেই পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত (ইএসজি) মানদণ্ড এবং পরিবেশবিষয়ক সনদ চাইছেন উল্লেখ করে আসিফ বলেন, বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট প্রকল্প ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎসও হতে পারে।
টেকসই রূপান্তরের জন্য কারখানা পর্যবেক্ষণ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ, মূল্যায়ন, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন এবং অগ্রগতি পরিমাপ—এই ছয় ধাপের একটি রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি।
আসিফ বলেন, টেকসই বিনিয়োগ শুধু প্রযুক্তিগতভাবে কার্যকর হলেই হবে না, আর্থিকভাবেও লাভজনক হতে হবে। এ জন্য বিনিয়োগের রিটার্ন (আরওআই), অভ্যন্তরীণ আয়ের হার (আইআরআর) এবং বিনিয়োগ ফেরত আসার সময় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

