রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

নির্বাচনী ধাক্কায় বিপাকে রিপাবলিকানরা, ২০২৮ সালের মনোনয়ন নিয়ে হিসাব-নিকাশ

ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারা ধরে রাখা, নাকি নতুন পথে এগোনো—দলটির সামনে বড় প্রশ্ন; ২০২৮ সালের মনোনয়ন ঘিরেও শুরু হচ্ছে হিসাব-নিকাশ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের পর আত্মসমালোচনায় নেমেছেন রিপাবলিকান নেতারা। নির্বাচনের ফলাফল দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন দলটির সামনে বড় প্রশ্ন—ট্রাম্পের নীতি ও রাজনৈতিক ভাবধারায় আরও বেশি জোর দেওয়া হবে, নাকি তাঁর মেয়াদের শেষ সময়ে নতুন কোনো পথে এগোবে রিপাবলিকান পার্টি।

ফ্লোরিডার বিদায়ী গভর্নর রন ডিস্যান্টিস এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে রিপাবলিকানদের জন্য ‘প্রায় ধ্বংসাত্মক এক ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যে কিছুটা আশাবাদ দেখা গেছে। নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে জনগণের ক্ষোভকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, দলটি এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে পরাজয়ের কারণ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে দলের ভেতরে ব্যাপক বিতর্ক হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

ভ্যান্স বলেন, কী ঘটেছে এবং কেন ঘটেছে, তা নিয়ে দলের মধ্যে প্রচুর কোন্দল ও বিতর্ক হবে।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিভক্তি

ডানপন্থী নেতাদের এমন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া রিপাবলিকান পার্টির দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যকেই সামনে এনেছে। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত উত্থানের পর থেকে দলটির মধ্যে যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। নির্বাচনী পরাজয়ের পর সেই বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ রিনা শাহ বলেন, দলটিকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকবে, নাকি রক্ষণশীলতার মতো বিস্তৃত রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নিজেদের গড়ে তুলবে, যা কট্টর রিপাবলিকান এলাকাগুলোর বাইরেও জয় এনে দিতে পারে।

ট্রাম্পের প্রথম হোয়াইট হাউস নির্বাচনী প্রচারণার বিরোধিতাকারী ‘নেভার ট্রাম্পার’ গোষ্ঠীও এবারের পরাজয়কে সামনে এনে দলকে ট্রাম্প-পূর্ববর্তী মূলধারার রাজনৈতিক অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

ট্রাম্পের এক দশকের রাজনৈতিক প্রভাবের সময়ে রিপাবলিকান পার্টিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অভিবাসনের মতো অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে দলটির অবস্থান আরও কট্টর ডানপন্থী হয়েছে। একই সঙ্গে জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের সামরিক হস্তক্ষেপনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসেছেন অনেক রিপাবলিকান।

কংগ্রেসে ট্রাম্পের বিরোধী হিসেবে পরিচিত মধ্যপন্থী ও মূলধারার রিপাবলিকানদের অবস্থানও দুর্বল হয়েছে। তাঁদের জায়গায় এসেছেন ট্রাম্পের সমর্থক কট্টর রক্ষণশীল নেতারা, যাঁরা তাঁর জাতীয়তাবাদী ও জনতাবাদী রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে একমত।

চলতি বছরের নির্বাচনেও সেই প্রবণতা দেখা গেছে। টেক্সাসের জন কর্নিন ও মেইনের সুসান কলিন্সের মতো পুরোনো ঘরানার রিপাবলিকান নেতারা, যাঁদের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ ছিল, তাঁরা নির্বাচনে হেরে গেছেন।

ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই

মধ্যবর্তী নির্বাচনের তিন দিন পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসকে সরিয়ে স্টিফেন মিলারকে নতুন দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পদক্ষেপকে ট্রাম্পের নীতিতে নমনীয়তা আনার অনিচ্ছার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। মিলার দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং কঠোর অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান রূপকার। এর আগে তিনি প্রেসিডেন্টের মুখ্য অভ্যন্তরীণ নীতি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলনের অন্যতম রূপকার স্টিভ ব্যানন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রিপাবলিকান পার্টিতে ‘গৃহযুদ্ধের’ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। পরাজয়ের জন্য অর্থনীতি ও বৈদেশিক যুদ্ধকে দায়ী করে তিনি ট্রাম্পকে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কারের নীতিতে আরও জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, কয়েকজন রিপাবলিকান কৌশলবিদ মনে করছেন, এবারের ফলাফল মাগা সমর্থকদের জন্য বড় ধাক্কা ও সতর্কবার্তা। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির পরও এই রাজনৈতিক আন্দোলন ধরে রাখতে চাইলে দলটির সমর্থনভিত্তি আরও বিস্তৃত করতে হবে।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ উইট এয়ার্স বলেন, এখনো অনেক মাগা সমর্থক ভোটার রয়েছেন, যাঁরা সব পরিস্থিতিতেই ট্রাম্পের পাশে থাকেন। তবে রিপাবলিকান পার্টির বড় একটি অংশ মাগা সমর্থক নন এবং তাঁরাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব রাখবেন কি প্রার্থীরা

টেক্সাস ও কানসাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-প্রধান রাজ্যগুলোতেও এবারের নির্বাচনে দলটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। এসব রাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এবার প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি গভর্নর ও রাজ্য আইনসভার নির্বাচনেও রিপাবলিকানরা পরাজিত হয়েছেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ল্যাটিনো ও তরুণ ভোটারসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সমর্থন বাড়িয়ে রিপাবলিকানদের ভোটভিত্তি বিস্তৃত করেছিলেন ট্রাম্প। তখন দলটির নেতারা এই সাফল্যকে ভবিষ্যতের শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দলটির সমর্থন কমেছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ভোটার তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের প্রতি ল্যাটিনো ভোটারদের সমর্থন ২৯ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে এ সমর্থন বেড়েছে ৩৩ শতাংশ পয়েন্ট।

অর্থনীতি, অভিবাসন এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে জনমনে অসন্তোষের যে চিত্র মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে উঠে এসেছিল, ভোটের ফলেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।

এ ছাড়া ট্রাম্প পরিবার ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যে ধারণা তৈরি হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা সেটিও নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগিয়েছে। হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণসহ ওয়াশিংটনের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রেসিডেন্টের মনোযোগ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের চেয়ে নিজের ভাবমূর্তি ও ব্যক্তিগত ঐতিহ্য রক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিলেন ট্রাম্প।

অস্টিনের ‘ইয়ং রিপাবলিকানস’-এর নেতা শ্রাডারও এ বিষয়ে সমালোচনা করেছেন। নির্বাচনের পর ট্রাম্পের প্রথম প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউসের বলরুম প্রকল্প ঘুরিয়ে দেখানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ট্রাম্প এখনো একজন ‘প্রাকৃতিক পরাশক্তি’। তবে তাঁর মতে, বলরুম বা বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তনের মতো বিষয় নয়, সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে ট্রাম্পের মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে অনেকেই মনে করছেন, ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীরা ট্রাম্পের কাছ থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।

২০২৮ সালের মনোনয়ন দৌড়ে ভ্যান্সের অবস্থান

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভ্যান্সের বক্তব্যে সতর্ক রাজনৈতিক অবস্থান দেখা গেছে। তিনি পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে একদিকে ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির পরোক্ষ সমালোচনা রয়েছে, অন্যদিকে মাগা সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয় রাজনৈতিক অবস্থানও ধরে রাখার চেষ্টা দেখা যায়।

ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এখন রিপাবলিকান নেতারা নজর রাখবেন। সংঘাত আরও বাড়লে ভ্যান্সসহ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকদের উদ্বেগও বাড়তে পারে।

এক্সে দেওয়া নির্বাচনী বিশ্লেষণেও ভ্যান্স ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পুনর্বিবেচনার বিষয়ে ডানপন্থীদের মধ্যে বাড়তে থাকা দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। পাশাপাশি অভিবাসন আইন প্রয়োগে কিছু পরিবর্তনের ব্যাপারেও তিনি খোলামেলা মনোভাব দেখিয়েছেন। তবে এ অবস্থান ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির অন্যতম রূপকার স্টিফেন মিলারের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রাজনৈতিক কৌশলবিদদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের দৌড়ে ভ্যান্সের অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে।

উইট এয়ার্স বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ২০২৮ সালের রিপাবলিকান মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে ভ্যান্সকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী মনে করা হতো। কিন্তু এবারের নির্বাচনের পর সেই লড়াই সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

মনোনয়ন ঘিরে বাড়ছে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা

২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী রিপাবলিকান নেতাদের খুব শিগগিরই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হতে পারে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রার্থিতা ঘোষণার প্রস্তুতি নিতে হবে তাঁদের। কেউ কেউ চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই প্রচারণা শুরু করতে পারেন।

নির্বাচনের পর ভ্যান্সের দেওয়া বিশ্লেষণকে অনেকে তাঁর সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার অনানুষ্ঠানিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। ফলে রিপাবলিকানদের প্রাথমিক মনোনয়ন লড়াইয়ে একাধিক প্রার্থীর অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ভ্যান্সের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ, ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস, জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি এবং নিউ জার্সির সাবেক গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি।

পরবর্তী নির্বাচনী চক্রে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস প্রার্থীদের ইসরায়েলে মার্কিন সমর্থন, শুল্কনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা কমতে পারে। তবে আগামী দুই বছর রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে তাঁর মতামতই সবচেয়ে জোরালো থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করবেন, নাকি দূরত্ব বজায় রাখবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ভ্যান্স ও রুবিওর প্রশংসা করলেও নিজের উত্তরসূরি হিসেবে কাকে দেখতে চান, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। উইট এয়ার্সের মতে, শেষ পর্যন্ত কারা মনোনয়ন দৌড়ে থাকবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর প্রার্থী তালিকা আগের ধারণার চেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন