সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বন্ধ পাটকলে ফিরছে উৎপাদন, ৫০ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

১৭ মিল লিজ, ৯টিতে ইতোমধ্যে উৎপাদন • নতুন তিন মিলে ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা • কর্মসংস্থান হতে পারে আরও ১১,৬২৯ জনের • বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ

বছরের পর বছর বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে আবারও উৎপাদনের চাকা ঘোরানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন এসব মিল পর্যায়ক্রমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়া ১৭টি পাটকলের মধ্যে ৯টিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এসব মিলে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মসংস্থান বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং দীর্ঘদিন অব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় শিল্পসম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিন মিলে ৬১৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার জন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইজারা চুক্তি হয়েছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ পেয়েছে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস লিমিটেড ও খুলনার স্টার জুট মিলস লিমিটেড। আর খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস লিমিটেড পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে হ্যামকো গ্রুপ।

তিনটি মিল পুনরায় চালু করতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে গেলে এসব কারখানায় অন্তত ১১ হাজার ৬২৯ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। সম্ভাব্য বার্ষিক মোট আয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে কর্মসংস্থান হতে পারে ৫ হাজার ২৩৮ জনের। সম্ভাব্য বার্ষিক মোট আয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলসে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এখানেও ৫ হাজার ২৩৮ মানুষের কর্মসংস্থান এবং বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা মোট আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলসে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। মিলটি চালু হলে কমপক্ষে ১ হাজার ১৫৩ জনের কর্মসংস্থান হতে পারে। সম্ভাব্য বার্ষিক মোট আয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।

আরও তিন পাটকল লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া

বিজেএমসির আরও তিনটি মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এগুলো হচ্ছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এমএম জুটমিল, রাঙ্গুনিয়ার কেএফডি লিমিটেড এবং নরসিংদীর পলাশের কো-অপারেটিভ জুটমিল।

বিজেএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির মালিকানাধীন ২৫টি পাটকলের মধ্যে ২০টি বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টির লিজ কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং বাকি তিনটির প্রক্রিয়া চলছে।

ঢাকার ডেমরার করিম জুট মিলস লিমিটেড ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেড বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

চট্টগ্রামের বিডিসিএফ বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি ও খুলনার আলিম জুট মিলস নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে। অন্যদিকে সীতাকুণ্ডের আমিন জুটমিল ফেরত পাওয়া গেছে এবং লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সেখানে উৎপাদন শুরু করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

২০২০ সালে বন্ধ হয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল

ধারাবাহিক লোকসান ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালের জুলাইয়ে বিজেএমসির আওতাধীন ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার। প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিকের পাওনা ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’-এর মাধ্যমে পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সে সময় সরকার জানিয়েছিল, মিলগুলো আধুনিকায়নের পর পিপিপি, যৌথ উদ্যোগ কিংবা লিজ ব্যবস্থায় আবার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিবেশবান্ধব পাটে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতিতে গতি আনা এবং অব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যেই বন্ধ মিলগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে স্বচ্ছ দরপত্রের মাধ্যমে মিলগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্যে বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণসুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

সরকারের লক্ষ্য, পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পলিথিন ও প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরতা কমানো। একই সঙ্গে জুট ডাইভার্সিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে পাটপণ্যের প্রদর্শনী, উদ্যোক্তা ও কারুশিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সহায়তায় নতুন বাজার তৈরির কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।

বন্ধ পাটকলগুলো পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে ফিরলে শুধু কর্মসংস্থান নয়, পাটের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ও শিল্প বিনিয়োগেও নতুন গতি আসতে পারে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন