হামলা-লুটপাটকে ‘সংগঠিত অপরাধ’ বললেন আসিফ মাহমুদ • পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ • নিরপেক্ষ তদন্ত ও পুনর্নির্মাণের দাবি • গ্রেপ্তার ৯, উদ্ধার দুই ট্রাক মালামাল
রাজধানীর মিরপুরে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার দখল করতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও সেখানেই স্বাস্থ্যকর্মীরা মা ও শিশুদের চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এনসিপির নেতাকর্মীদের নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শনে যান আসিফ মাহমুদ। এ সময় তিনি ধ্বংস হওয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং সেখানে সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন।

পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র নামে লাগানো সাইনবোর্ড এনসিপির নেতাকর্মীরা সরিয়ে দেন।
‘দখল করতে দেওয়া হবে না’
পরিদর্শন শেষে আসিফ মাহমুদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মা ও শিশুদের চিকিৎসা, টিকাদানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসা একটি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, “রাড্ডা ক্লিনিক দখল করতে দেওয়া হবে না। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই মা ও শিশুদের চিকিৎসা দেবেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।”
বাস্তবেও ভবন ধ্বংসের পর স্বাস্থ্যকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের পাশে শিশুদের টিকাদান চালিয়ে যাচ্ছেন। হামলার প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পরও একজন টিকাদানকর্মী সেখানে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
‘এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সংগঠিত অপরাধ’
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ আসিফ মাহমুদ। তিনি অভিযোগ করেন, এর সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তি, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং স্থানীয় পুলিশের ভূমিকার প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, “এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না।” এরপর তিনি বিএনপির একজন এমপি, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ তোলেন এবং ঘটনাটিকে কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতায় সংঘটিত ‘সংগঠিত অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে আসিফ মাহমুদের এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্যগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন আসিফ মাহমুদ। তার অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও ভাঙচুর শুরু হওয়ার পর সেখান থেকে চলে যায় এবং ধ্বংসযজ্ঞ শেষ হওয়ার পর আবার ঘটনাস্থলে আসে।
প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজেও হামলা ও লুটপাটের সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে পুলিশের একটি গাড়ি অবস্থান করতে দেখা গেছে। ফুটেজে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মালামাল বের করে পিকআপে তোলার দৃশ্যও দেখা যায়।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদও পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও কঠোর বক্তব্য
দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে বলে মন্তব্য করেন আসিফ মাহমুদ।
তিনি বলেন, “এটা যদি আপনারা কোনো ধরনের বিচার এবং ব্যবস্থা দ্রুত সময়ের মধ্যে না নেন, তাহলে আমরা মনে করব এটা প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই অবগত আছেন এবং সবাই এটার ভাগ পাবেন।”
এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় দ্রুত দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
ওষুধ-টিকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ
আসিফ মাহমুদ বলেন, হামলাকারীরা শুধু স্থাপনা ভাঙচুর করেনি; স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধ, টিকা, ইনজেকশন ও বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামও নিয়ে গেছে। গরিব মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে এভাবে ধ্বংস করার ঘটনায় তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে রাত ২টার মধ্যে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালায়। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীদের অনেকে মুখোশ পরা ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, নগদ অর্থ ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যাওয়ার পর ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে স্থাপনাগুলো ভেঙে দেওয়া হয়।
গ্রেপ্তার ৯, উদ্ধার দুই ট্রাক মালামাল
ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে লুট হওয়া চিকিৎসা সরঞ্জামসহ দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে বলে রোববার জানিয়েছে ডিএমপি।
এর আগে গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তারা হলেন মো. সোহেল, মো. জুয়েল, মো. জিহাদ হাসান ও মো. রাবিব।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আক্তার শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মিরপুরের বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তারা অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হবেন।
শাহ আলী থানার ওসি প্রত্যাহার
ঘটনার পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। ডিএমপি জানিয়েছে, তাকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশের কোনো দায়িত্বহীনতা বা ব্যর্থতা ছিল কি না, তা তদন্তের জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
নাহিদ ইসলামেরও নিন্দা
এর আগে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস ও লুটপাটের নিন্দা জানান।
তিনি বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা এবং টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা একটি প্রতিষ্ঠান মধ্যরাতে ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতার ভয়াবহ উদাহরণ।
ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান তিনি।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও পুনর্নির্মাণের দাবি
আসিফ মাহমুদ সরকারের প্রতি দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। হামলার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন, দ্রুত পুনর্নির্মাণ এবং মা ও শিশুদের চিকিৎসা ও টিকাদানসহ পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন এনসিপির এই নেতা।
ধ্বংসস্তূপের পাশে স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকাদান অব্যাহত থাকা এবং রাজনৈতিক নেতাদের ধারাবাহিক প্রতিবাদের মধ্যে এখন নজর তদন্তের দিকে—কার নির্দেশে দুই শতাধিক মানুষ মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালিয়েছিল, ভারী যন্ত্র এনে স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার পেছনে কারা ছিল এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরও পুলিশ কেন তা প্রতিরোধ করতে পারেনি—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন সামনে আসা জরুরি।

