সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামে ভ্যাট আদায় বেড়েছে প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ১১.৭ শতাংশ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদায় ১৮ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা • লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ৪ হাজার ৩৫৯ কোটি • উচ্চ ঝুঁকির প্রতিষ্ঠান নজরদারি ও নতুন নিবন্ধনে বেড়েছে করজাল

ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব এবং আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার চাপের মধ্যেও চট্টগ্রামে এক অর্থবছরে ভ্যাটসহ বিভিন্ন খাতে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৪৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

তবে প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি কমিশনারেট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার ৭৯৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় কম হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩৫৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা বা ১৯ দশমিক ১২ শতাংশ।

এক বছরে বেড়েছে ১,৭৯৮ কোটি টাকা

কমিশনারেটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট, আবগারি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও জরিমানাসহ মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৬ হাজার ৬৩৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ১৮ হাজার ৪৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা।

কর্তৃপক্ষ বলছে, করজালের বাইরে থাকা নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা, উচ্চ ঝুঁকির প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো এবং অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ব্যবহার বৃদ্ধির প্রভাব রাজস্ব আদায়ে পড়েছে।

প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু লক্ষ্য অধরা

চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার শেখ আবু ফয়সল মোহাম্মদ মুরাদের ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও বছর শেষে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

আমদানি-রপ্তানি হ্রাস এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দাভাব ভ্যাট আদায়ে প্রভাব ফেলেছে বলে জানান তিনি। তবে ব্যবসায়ীদের ভ্যাট পরিশোধে উৎসাহিত করা এবং রাজস্ব আহরণের পরিধি বাড়াতে কর্মকর্তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সেপ্টেম্বরের প্রবৃদ্ধি ২৭ শতাংশের বেশি

অর্থবছরের মাসভিত্তিক হিসাবে রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা গেছে।

জুলাইয়ে আদায় হয় ১ হাজার ৭০২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। তবে মাসটির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ছিল ৩০০ কোটি ২০ লাখ টাকা।

আগস্টে আদায় নেমে আসে ১ হাজার ২৮৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ।

সেপ্টেম্বরে চিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যায়। ওই মাসে রাজস্ব আদায় হয় ১ হাজার ৭৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকা—আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩৮১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বা ২৭ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। সেপ্টেম্বর ছিল এমন একটি মাস, যখন লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়।

মার্চে বড় ধাক্কা

অক্টোবরে ১ হাজার ৪১৩ কোটি ৭৭ লাখ, নভেম্বরে ১ হাজার ৩৮৯ কোটি ৮৪ লাখ এবং ডিসেম্বরে ১ হাজার ৭৫২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়।

জানুয়ারিতে আদায় ছিল ১ হাজার ৪১৫ কোটি ৮২ লাখ এবং ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৪১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

তবে মার্চে রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা আসে। মাসটিতে আদায় নেমে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৬০ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। আগের বছরের মার্চের তুলনায় আদায় কমে ১৪৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়ায় ৭৮২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

পরবর্তী দুই মাসে আবার বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। এপ্রিলে আদায় হয় ১ হাজার ৬৮৪ কোটি ৮২ লাখ এবং মে মাসে ১ হাজার ৪১৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

অর্থবছরের শেষ মাস জুনে আদায় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৮৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকায়, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি।

রিস্ক প্রোফাইলিংয়ে নজর উচ্চ ঝুঁকির প্রতিষ্ঠানে

রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি সম্প্রসারণে ‘রিস্ক প্রোফাইলিং’ বা ঝুঁকি বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এ পদ্ধতিতে উচ্চ ঝুঁকির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শনাক্ত করে তাদের লেনদেন ও ভ্যাট রিটার্ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে করজালের বাইরে থাকা নতুন প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনার ফলে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি সম্প্রসারিত হয়েছে।

চলতি অর্থবছরেও একই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে কমিশনারেট। সরকারি সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও এনজিওসহ উৎসে ভ্যাট কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্যাট ফাঁকি শনাক্ত এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া রাজস্ব আদায়ে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

রাজস্ব প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারাকে ধরে রেখে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আদায়ের মধ্যে থাকা বড় ব্যবধান কমিয়ে আনা।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন