শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ববাজারে কমছে জ্বালানি তেলের দাম

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনায় কমছে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ • ব্রেন্ট ১০২ ডলারের কাছাকাছি • যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত বেড়েছে ৩০ লাখ ব্যারেল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির আভাসে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবার কমতে শুরু করেছে। আগের দিনের প্রায় ৪ শতাংশ উল্লম্ফনের পর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)—দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই নিম্নমুখী হয়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৪টার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ সেন্ট বা প্রায় ০.৯ শতাংশ কমে ১০২ দশমিক ১৬ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআইয়ের দাম ৭৭ সেন্ট বা প্রায় ০.৮ শতাংশ কমে ৯১ দশমিক ৩৯ ডলারে দাঁড়ায়।

এর আগে বুধবার বাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়। ওই দিন ব্রেন্টের দাম ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ০৮ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ১ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ৯২ দশমিক ১৬ ডলারে নিষ্পত্তি হয়েছিল। অর্থাৎ এক দিনের তীব্র ঊর্ধ্বগতির পর বাজার আবার কিছুটা সংশোধনের পথে ফিরেছে।

কয়েক দিনে বড় ওঠানামা

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের বাজারচিত্রে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও কূটনৈতিক তৎপরতার খবরের সঙ্গে তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা করছে। ২১ সেপ্টেম্বর ব্রেন্টের দাম ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০০ দশমিক ৩৪ ডলারে নেমেছিল; ডব্লিউটিআইয়ের অক্টোবর চুক্তি ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ৯৫ দশমিক ৭৮ ডলারে দাঁড়ায়। ওই সময় দুই বেঞ্চমার্কই ৯ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।

২২ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনায় ব্রেন্ট আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালু এবং ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা বাজারে সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কা কিছুটা কমিয়ে দেয়।

কেন কমছে তেলের দাম

বর্তমান দরপতনের অন্যতম কারণ ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা। ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে। আলোচনায় ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির প্রত্যাশায় তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত ভূরাজনৈতিক ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’-এর একটি অংশ কমে যাচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় ব্রেন্টের দামে এখনো উল্লেখযোগ্য ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি যুক্ত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে মজুতও বেড়েছে

দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরির আরেকটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত বৃদ্ধি। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (EIA) তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩০ লাখ ব্যারেল বেড়ে ৪২৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে। অথচ রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ব্যারেল মজুত কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। প্রত্যাশার বিপরীতে মজুত বৃদ্ধি বাজারে সরবরাহ নিয়ে স্বস্তি বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে কমলে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কমার সুযোগ তৈরি হয়। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক বা দুই দিনের দরপতন মানেই দেশের বাজারে সঙ্গে সঙ্গে দাম কমবে—এমন নয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারদরের পাশাপাশি আমদানি ও পরিবহন ব্যয়, বিনিময় হার, কর-শুল্ক এবং মূল্য সমন্বয়ের সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিও অত্যন্ত অস্থির। ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অগ্রগতি হলে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন আরও স্বাভাবিক হলে বিশ্ববাজারে দাম কমার চাপ বাড়তে পারে। বিপরীতে সংঘাত আবার তীব্র হলে সরবরাহ-ঝুঁকি বেড়ে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন