জাপান শীর্ষে, বাড়ছে অস্ট্রেলিয়া-ভারত-তুরস্কে রপ্তানি • মোট পোশাক রপ্তানিতে নতুন বাজারের অংশ ১৬.৩২ শতাংশ • প্রচলিত বাজারনির্ভরতা কমানোর সুযোগ
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে অপ্রচলিত বাজার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রচলিত গন্তব্যের বাইরে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আগস্টে এসব বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৬৪২ দশমিক ৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা এক মাসে এ খাতে সর্বোচ্চ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, গত দুই বছর অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে স্থবির থাকলেও চলতি অর্থবছরের শুরুতে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শুধু রপ্তানির পরিমাণ নয়, এসব বাজারে মাসিক গড় রপ্তানিও বেড়েছে।
মাসিক গড় রপ্তানিতেও উল্লম্ফন
২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাকের মাসিক গড় রপ্তানি ছিল ৫৭৪ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সেই গড় বেড়ে ৬১১ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের অংশও বাড়ছে। গত অর্থবছরে মোট পোশাক রপ্তানির ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ এসেছিল এসব গন্তব্য থেকে। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাজারনির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি গন্তব্য আরও বহুমুখী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানে সবচেয়ে বেশি, এক মাসেই প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলার
আগস্টে অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল জাপান। দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ১১৮ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক।
এরপর অস্ট্রেলিয়ায় ৭৫ দশমিক ১৪ মিলিয়ন, ভারতে ৭২ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন, তুরস্কে ৫৯ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৫ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাকের উপস্থিতি লক্ষণীয়। আগস্টে মেক্সিকোয় রপ্তানি হয়েছে ৩২ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৮ দশমিক ৬২ মিলিয়ন, ব্রাজিলে ২৪ দশমিক ২৪ মিলিয়ন, চীনে ২০ দশমিক ৭০ মিলিয়ন এবং সৌদি আরবে ১৯ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় ১৫ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন, চিলিতে ১৩ দশমিক ১৫ মিলিয়ন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন, রাশিয়ায় ৯ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন এবং নিউজিল্যান্ডে ৮ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারের পোশাক গেছে। অন্যান্য অপ্রচলিত বাজার মিলিয়ে রপ্তানি হয়েছে আরও ৮৫ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলার।
‘শত শত বিলিয়ন ডলারের বাজার’
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। এতদিন এসব গন্তব্য সম্ভাবনার তুলনায় প্রয়োজনীয় মনোযোগ পায়নি। এখন বাজারগুলোকে কৌশলগতভাবে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, অপ্রচলিত বাজারকে কেবল উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজার হিসেবে দেখলে পুরো সম্ভাবনা বোঝা যাবে না। বিভিন্ন শ্রেণি ও দামের পোশাকের বড় চাহিদা রয়েছে এসব দেশে এবং সম্মিলিতভাবে বাজারের আকার শত শত বিলিয়ন ডলার।
তাঁর মতে, প্রচলিত কয়েকটি গন্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হলে এসব বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
মোট পোশাক রপ্তানি ৩.৬১ বিলিয়ন ডলার
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বাংলাদেশ থেকে মোট ৩ দশমিক ৬০৯ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে অপ্রচলিত বাজার থেকেই এসেছে প্রায় ৬৪৩ মিলিয়ন ডলার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় প্রতি ছয় ডলারের এক ডলার এসেছে অপ্রচলিত বাজার থেকে। ফলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বাজারের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
রপ্তানি গন্তব্যে এই বৈচিত্র্য বাংলাদেশের জন্য দুটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ—একদিকে প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ, অন্যদিকে নতুন দেশে বাংলাদেশের পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ।
আগস্টের রেকর্ড রপ্তানি সেই সম্ভাবনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখন এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি বাজারের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

