শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘সমুদ্রের উচ্চতার চেয়েও দ্রুত হোক আমাদের পদক্ষেপ’: তারেক রহমান

বৈশ্বিক নিঃসরণ দ্রুত কমানোর আহ্বান • জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সহজলভ্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তি চান প্রধানমন্ত্রী • ২৫ কোটি গাছ ও ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খননের পরিকল্পনা তুলে ধরলেন বিশ্বমঞ্চে

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব থেকে বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে রক্ষায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে অভিযোজন অর্থায়ন, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি এবং জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “সমুদ্রের উচ্চতার সঙ্গে আমাদের সংকল্পও আরও দৃঢ় হোক, আর আমাদের পদক্ষেপ হোক তার চেয়েও দ্রুত।”

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত সংকট মোকাবিলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান।

‘শুধু অভিযোজন দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়’

তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এজন্য কার্যকর বৈশ্বিক সহায়তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

বিশ্বে যত কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, সমুদ্র তার প্রভাব বহন করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু অভিযোজনমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে আরও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশকে একটি সক্রিয় বদ্বীপ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, শত শত নদী দেশের ভূখণ্ড অতিক্রম করে সাগরে মিলিত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলীয় পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

২৫ সেন্টিমিটার উচ্চতা বাড়লেই ঝুঁকিতে এক কোটি মানুষ

বিশ্বব্যাংকের হিসাব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সীমিত সম্পদের মধ্যেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ানো এবং উপকূলীয় সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল, ২৫ কোটি গাছ

জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে বাংলাদেশের নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন তারেক রহমান।

তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুদ্ধার এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

পানি ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া এবং মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি সবুজ শিল্প, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান।

বিশ্বনেতাদের সামনে চার জরুরি পদক্ষেপ

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে চারটি জরুরি করণীয় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রথমত, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ আরও দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সংগতভাবে কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে’

প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, সমুদ্রের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে; তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কার্যক্রমকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সময় এখনই।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে এবং ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে অঙ্গীকারগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেবে—এমন প্রত্যাশা জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বৈশ্বিক সংকটের মুখে কোনো দেশকে যেন একা লড়াই করতে না হয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন