১.৫ ডিগ্রির সীমা রক্ষা, সুলভ অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিল বাস্তবায়নে গুরুত্ব
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের সম্মিলিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে তিনি জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণসহ পাঁচটি জরুরি বৈশ্বিক পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের অংশ হিসেবে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
নিঃসরণে অবদান সামান্য, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈপরীত্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানির নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমপরিমাণ। জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে চলতি বাজেটে প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ
জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগও বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়াতে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সরকারের এই বৃক্ষরোপণ ও নদী-খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচির তথ্য এর আগেও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
২০৩০ সালে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ
জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং সার্কুলার অর্থনীতিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সবুজ শিল্পের প্রসারে সরকার কাজ করছে। একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বনেতাদের প্রতি পাঁচ আহ্বান
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি বৈশ্বিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
প্রথমত, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও কার্যকরভাবে কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে, যাতে বৈশ্বিক জলবায়ু উত্তরণ ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক হয়।
চতুর্থত, সুলভ অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে।
পঞ্চমত, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য গঠিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ বা ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল পুরোপুরি কার্যকর করার পাশাপাশি এতে নিয়মিত অর্থ পুনঃপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
‘একা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু সংকট কোনো একক দেশের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’—এই আন্তর্জাতিক নীতির ভিত্তিতে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যকর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
তারেক রহমান বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণ হওয়ার কথা।

