শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত, বাংলাদেশের সামনে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

রিজার্ভে উন্নতি • শক্তিশালী রেমিট্যান্স • ১.৩ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইন • বিনিয়োগ পরিবেশে সংস্কার • রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন উদ্যোগ

বিশেষ প্রতিবেদন

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশ্ববাণিজ্যের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিও কঠিন সময় পার করছে। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণ ও বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, বিনিয়োগ পরিবেশ সহজীকরণ এবং অবকাঠামো ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের আগস্টে এ দুই হিসাবে রিজার্ভ ছিল যথাক্রমে ৩১ দশমিক ১৭ ও ২৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ক্ষেত্রে আগের বছরের তুলনায় দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।

রেমিট্যান্সও অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন মাসে প্রবাসী আয় শক্তিশালী ছিল; মার্চে এক মাসেই আসে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়েও প্রবাসীরা প্রায় ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন। এডিবির সর্বশেষ মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং শক্তিশালী রেমিট্যান্স ও উচ্চতর রিজার্ভ বহিঃখাতের স্থিতিশীলতায় সহায়ক হতে পারে।

বিনিয়োগে নতুন বার্তা

বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ব্যবসা সহজীকরণকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেওয়া হয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদনে সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইন প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে অগ্রসর হয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি সেবা সহজ করতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিনিয়োগ সহায়তা, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ছাড়পত্র দ্রুত করা, বৈদেশিক অর্থায়নের প্রক্রিয়া সহজ করা, মূলধন প্রত্যাবাসনের নিয়ম স্পষ্ট করা এবং সরকারি সেবা ডিজিটাল করার মতো বিষয়েও কাজ চলছে।

সেপ্টেম্বরে জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের এক কমিশন সভায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ সংস্কার বাস্তবায়নের একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসে।

রপ্তানির নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা হলো তৈরি পোশাক ও সীমিত কয়েকটি রপ্তানি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এলডিসি উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কায় রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আইএমএফও বলছে, বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন জরুরি।

এই প্রেক্ষাপটে জাপানসহ নতুন ও উচ্চমূল্যের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ জোরদার এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অবকাঠামো হতে পারে বড় শক্তি

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর সক্ষমতা সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উন্নত লজিস্টিকস সুবিধা পুরোপুরি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান এবং বড় অভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা, দ্রুত কাস্টমস সেবা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ

ইতিবাচক সূচক থাকলেও অর্থনীতি এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আহরণ এবং মন্থর বেসরকারি বিনিয়োগকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির উচ্চমূল্য, আমদানি ব্যয় এবং বহিঃখাতের ওপর নতুন চাপ তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে।

এডিবির সেপ্টেম্বরের মূল্যায়নেও বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে প্রবেশ করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে এই পুনরুদ্ধারকে বহিঃস্থ ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। সংস্থাটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সংকটের মধ্যেই সুযোগ

বাংলাদেশের সামনে তাই চিত্রটি একমুখী নয়। একদিকে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ঘাটতি ও বিনিয়োগের দুর্বলতা; অন্যদিকে বাড়তে থাকা রিজার্ভ, শক্তিশালী রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ সহজীকরণের উদ্যোগ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা।

এই ইতিবাচক সূচকগুলোকে স্থায়ী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।

বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশের জন্য শুধু ঝুঁকিই তৈরি করছে না; আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের এই সময় নতুন বিনিয়োগ ও বাজার ধরার সুযোগও তৈরি করছে। সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বর্তমান ইতিবাচক উদ্যোগগুলো কত দ্রুত বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে রূপ নেয় তার ওপর।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন