শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের কূটনৈতিক লড়াই

যুদ্ধ থামানো থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন—সমাধানের খোঁজে বিশ্ব

খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশন • ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় কূটনীতির নতুন তৎপরতা • ইউক্রেন যুদ্ধেও সীমিত যুদ্ধবিরতির আলোচনা • রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাঁচ দফা • জলবায়ু, এআই ও জাতিসংঘ সংস্কারেও বিশ্বনেতাদের জোরালো বার্তা

এক নজরে

  • জাতিসংঘের মূল মঞ্চে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান
  • ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনার পথ খোঁজার চেষ্টা
  • রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সীমিত যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা
  • রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের পাঁচ দফা
  • জলবায়ু সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জাতিসংঘ সংস্কারও আলোচনার কেন্দ্রে

প্রান্তকাল ডেস্ক | নিউইয়র্ক, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধের আগুন একদিকে ইউক্রেন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে। সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক বিভাজন। এমন এক অস্থির বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে মুখোমুখি হয়েছেন বিশ্বনেতারা।

২২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া সাধারণ বিতর্কের পর থেকেই একের পর এক ভাষণ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সাইড ইভেন্টে উঠে আসছে বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সংকটগুলো। জাতিসংঘের মঞ্চে যেমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রকাশ পাচ্ছে, তেমনি পর্দার আড়ালে চলছে সমঝোতার পথ খোঁজার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশের জন্য এবারের অধিবেশনের রয়েছে বাড়তি গুরুত্ব। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের প্রতিপাদ্য—“Restoring trust, managing transformation: A United Nations that delivers for all.”

জাতিসংঘের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ

সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক রাজনৈতিক মঞ্চ পরিচালনায় একজন বাংলাদেশির অবস্থান এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য তৈরি করেছে।

সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী পর্বে জাতিসংঘের কার্যকারিতা, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা এবং পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার বিষয় উঠে আসে।

যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান গুতেরেসের

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর বক্তব্যে বিশ্বের চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যকর বৈশ্বিক তদারকির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন, মানবিক সংকট এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও তিনি বিশ্বনেতাদের সম্মিলিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, তবু আলোচনার পথ খোলা

এবারের সাধারণ পরিষদের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চাপের মুখে তেহরান আত্মসমর্পণ করবে না বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। নিউইয়র্কে উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের মধ্যেই দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা চলছে।

ফলে জাতিসংঘের মঞ্চ শুধু পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের জায়গা নয়—ইরান সংকটের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার ক্ষেত্র হিসেবেও নিউইয়র্ক এখন আন্তর্জাতিক নজরে।

ইউক্রেন যুদ্ধেও নতুন সমীকরণ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন সীমিত যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা সামনে এসেছে।

তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী শান্তিচুক্তির কোনো ঘোষণা আসেনি।

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পাঁচ দফা

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি রোহিঙ্গা সংকট।

‘The Rohingya Crisis: A Renewed Call for a Durable Solution from Protracted Displacement, with Justice and Accountability’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংকটের স্থায়ী সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।

প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং মানবপাচার, মাদক অর্থনীতি ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের বক্তব্য—রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই হতে হবে।

ট্রাম্প-খলিলুর রহমান কুশল বিনিময়

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ড. খলিলুর রহমানের সংক্ষিপ্ত কুশল বিনিময়ও হয়েছে।

ট্রাম্পের সাধারণ পরিষদের ভাষণের পর তাদের মধ্যে এ কথোপকথন হয়। তবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

জলবায়ু সংকটেও বড় বার্তা

জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে জলবায়ু পরিবর্তনও বড় জায়গা দখল করেছে। আলোচনায় জ্বালানি রূপান্তর, জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয় সামনে এসেছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও অভিযোজন অর্থায়নের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়েও উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচি রয়েছে।

নিউইয়র্কে এখন কূটনীতির ব্যস্ততম সময়

সব মিলিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব একই সঙ্গে একাধিক যুদ্ধ, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূরাজনৈতিক বিভাজনের মুখোমুখি।

জাতিসংঘের মঞ্চে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট। কিন্তু একই ভবনের বৈঠককক্ষ ও সাইডলাইনে চলছে সংঘাত কমানো, সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য সমঝোতার পথ তৈরির চেষ্টা।

বাংলাদেশের জন্য এবারের অধিবেশনের দুটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্ব এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশের নতুন পাঁচ দফা প্রস্তাব।

এখন নজর ২৪ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী উচ্চপর্যায়ের কার্যক্রমে। যুদ্ধ, জলবায়ু ও মানবিক সংকট নিয়ে নিউইয়র্ক থেকে নতুন কোনো সমঝোতার বার্তা আসে কি না—সেদিকেই তাকিয়ে বিশ্ব।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন