রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকা দক্ষিণে ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান

জরিপে ৭৫ ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত, ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি পরিদর্শনে ৩২২টিতে এডিসের লার্ভা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) জরিপে চিহ্নিত ২৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে বিশেষ চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। অভিযানের আওতায় নিবিড় পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারের (বি-টাইপ) প্রাঙ্গণে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।

৭৫ ওয়ার্ডে এডিস লার্ভা জরিপ

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রশাসক জানান, ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিরূপণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডে ১২ দিনব্যাপী ‘বর্ষাকালীন এডিস লার্ভা জরিপ ২০২৬’ পরিচালনা করা হয়।

জরিপের আওতায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী আধুনিক ‘কোবো টুলবক্স’ (Kobo Toolbox) ব্যবহার করে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করেন।

জরিপে প্রাপ্ত তথ্য এবং এডিস মশার ঘনত্ব নিরূপণের বিভিন্ন সূচক—ব্রেটো ইনডেক্স (BI), হাউস ইনডেক্স (HI), কনটেইনার ইনডেক্স (CI) ও পিউপা ইনডেক্স (PI)—বিশ্লেষণ করে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৮টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিদর্শন করা বাড়িগুলোর মধ্যে ৩২২টিতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়। শনাক্ত হওয়া লার্ভা তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

যেসব স্থানে বেশি মিলেছে লার্ভা

জরিপে দেখা গেছে, বহুতল ও সেমি-পাকা ভবন, স্বতন্ত্র বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন এবং খালি প্লটে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অন্যতম উৎস।

প্রশাসক জানান, জরিপে প্লাস্টিক বালতিতে ১৪.২১ শতাংশ, প্লাস্টিক ড্রামে ১১.২২ শতাংশ, বেইজমেন্টের জমে থাকা পানিতে ৯.৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিক মগে ৯.২৩ শতাংশ এবং ফুলের টবে ৫.৯৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ, নাগরিকেরা নিজ নিজ আঙিনা ও পানির পাত্রের বিষয়ে সচেতন হলে প্রাথমিক পর্যায়েই ৫০.৯ শতাংশ এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অভিযানে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধনে গুরুত্ব

জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে আজ ৮ নভেম্বর থেকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৯টি ওয়ার্ডে একযোগে বিশেষ চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে।

কর্মসূচির আওতায় নিবিড়ভাবে লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ড্রেন-খাল ও নালা-নর্দমা পরিষ্কার এবং বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে।

পাশাপাশি মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও মসজিদের মাধ্যমে জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান চালানো হবে।

এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে মতবিনিময় ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এরপরও কোথাও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান

প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি কর্পোরেশনের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। নিজ নিজ বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, আঙিনা ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। অন্তত সপ্তাহে এক দিন জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, জরিপে প্লাস্টিক বালতি, ড্রাম, বেইজমেন্টের জমে থাকা পানি, প্লাস্টিক মগ ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। নাগরিকেরা নিজ আঙিনা ও পানির পাত্রের বিষয়ে সচেতন হলেই প্রাথমিক অবস্থায় অর্ধেকের বেশি এডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি কমিয়ে নগরবাসীর জন্য সুস্থ, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন