২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র, নথি কিনেছে তিন বিদেশি প্রতিষ্ঠান; ৩০ নভেম্বর জমা দেওয়ার শেষ সময়, এক্সনমবিল-বিপিসহ বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে চীন ও তুরস্কের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানের জন্য আহ্বান করা আন্তর্জাতিক দরপত্রের নথি সংগ্রহে এগিয়ে রয়েছে। এরই মধ্যে চীনের সিনোপেক ও সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল এবং তুরস্কের টার্কিশ পেট্রোলিয়াম ওভারসিজ কোম্পানি (টিপিএও) দরপত্রের আনুষ্ঠানিক তথ্যপ্যাকেজ কিনেছে।
পেট্রোবাংলার দরপত্র-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সিনোপেক দরপত্রের তথ্যপ্যাকেজ ও প্রয়োজনীয় নথির পাশাপাশি বিশেষায়িত ডেটা প্যাকেজ কিনেছে। সমুদ্রের তলদেশের ভূতাত্ত্বিক গঠন, সম্ভাব্য তেল-গ্যাসের মজুত এবং অনুসন্ধানের কারিগরি সম্ভাবনা মূল্যায়নের জন্য এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান দরপত্রে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির আরও অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছানো সর্বশেষ বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানি হিসেবে যুক্ত হয়েছে সিনোপেক।
এর আগে গত ১৭ আগস্ট সিএনওওসি ইন্টারন্যাশনাল আনুষ্ঠানিক তথ্যপ্যাকেজ কেনে। আর ২৩ জুলাই দরপত্রের নথি কেনে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী শাখা টিপিএও।
২৬টি সমুদ্র ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ২৪ মে দ্বিতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে বঙ্গোপসাগরের অগভীর সমুদ্রের ১১টি এবং গভীর সমুদ্রের ১৫টিসহ মোট ২৬টি ব্লক আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কাছে অনুসন্ধানের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ৩০ নভেম্বর।
সমুদ্রসীমায় নতুন গ্যাসের মজুত অনুসন্ধান এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা পূরণের সম্ভাবনা বিবেচনায় এ দরপত্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগ ও কার্যক্রমে রূপ দিতে হলে দরপত্রে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিশ্বের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে দরপত্রে যুক্ত করতে যোগাযোগ ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমবিল, ব্রিটিশ কোম্পানি বিপি, মারফি অয়েল, ব্রাজিলের পেট্রোব্রাস এবং কুয়েত ফরেন পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি (কুফপেক)।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. শোয়েব বলেন, এখন পর্যন্ত ১০টি কোম্পানি তথ্যপ্যাকেজ কিনেছে। তবে দরপত্রের আনুষ্ঠানিক নথি কিনেছে তিনটি কোম্পানি।
তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি, আগামী দিনগুলোতে আরও কয়েকটি বড় জ্বালানি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনবে। এ বিষয়ে এক্সনমবিল, বিপিসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”
তথ্যপ্যাকেজ কিনেছে দেশি-বিদেশি ১০ প্রতিষ্ঠান
পেট্রোবাংলার বিক্রির তথ্য অনুযায়ী, দরপত্র প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তথ্যপ্যাকেজ কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানি, গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং দেশীয় অবকাঠামো ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তথ্যপ্যাকেজ কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে বেরিঞ্জিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড, ক্রিসএনার্জি, পিইএএল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, ওনোডা ইনকরপোরেটেড, রাইস্ট্যাড এনার্জি, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইমপ্রেশন ভেঞ্চারস এজি। এ ছাড়া চীনের সিনোপেক ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডও তথ্যপ্যাকেজ সংগ্রহ করেছে।
তবে তথ্যপ্যাকেজ কেনা এবং দরপত্রের আনুষ্ঠানিক নথি কেনা এক বিষয় নয়। তথ্যপ্যাকেজে সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক তথ্য থাকে। অন্যদিকে, প্রমোশনাল প্যাকেজ ও বিশেষায়িত ডেটা প্যাকেজে দরপত্রের শর্তাবলি, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং অনুসন্ধানের কারিগরি দিক সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
কোম্পানিগুলো এসব তথ্য পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্লকে অনুসন্ধানের সম্ভাবনা, ঝুঁকি ও সম্ভাব্য ব্যয় মূল্যায়ন করে। এরপর তারা দরপত্রে অংশ নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে তথ্যপ্যাকেজ সংগ্রহকে প্রাথমিক আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও আনুষ্ঠানিক নথি কেনা দরপত্রে অংশগ্রহণের প্রস্তুতির তুলনামূলক অগ্রসর ধাপ।
এক্সনমবিল, বিপি ও এনির সঙ্গে আলোচনা
আন্তর্জাতিক বড় কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলার যোগাযোগও জোরদার হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক্সনমবিল, বিপি ও এনির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল।
দরপত্র আহ্বানের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান এক্সনমবিল পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে প্রতিষ্ঠানটির এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে অনলাইন বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এক্সনমবিল জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রতিষ্ঠানটি একটি ডেটা প্যাকেজ কিনেছিল। এবারের দরপত্রেও অংশ নিতে প্রয়োজনীয় নথি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তারা। তবে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক নথি কেনার বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি।
এক্সনমবিলসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য জ্বালানি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদলের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা রয়েছে। সফরে দেশটির বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানি বিপিও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা পেট্রোবাংলার সঙ্গে অনলাইন বৈঠক করেন।
গভীর সমুদ্রে অভিজ্ঞ কোম্পানিগুলোর দিকে নজর
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখানো বা এ বিষয়ে যোগাযোগ করা কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানির বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অগভীর ও গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাময় ব্লকগুলোর অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনভিত্তিক মারফি অয়েল করপোরেশন একটি স্বতন্ত্র তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। মেক্সিকো উপসাগরে গভীর সমুদ্রের শতাধিক ব্লকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ও অংশীদারত্ব রয়েছে। এ ছাড়া ব্রাজিল, ভিয়েতনাম ও আইভরিকোস্টের সমুদ্রসীমায়ও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
ব্রাজিলের পেট্রোব্রাস গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত। দেশটির গভীর সমুদ্রে উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির আওতায় থাকা ১৪টি বড় তেল-গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে আইভরিকোস্টের গভীর সমুদ্রের আটটি ব্লকে উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির আওতায় অনুসন্ধানের জন্যও একটি চুক্তি করেছে পেট্রোব্রাস।
কুয়েতের কুফপেকের ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ চীন সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদন প্রকল্পে বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গ্যাস অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে ১৫৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এসব প্রকল্প থেকে ২০২৮ সালে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে তিনটি পৃথক উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির আওতায় চীনের সিএনওওসির সঙ্গে কাজ করছে কুফপেক।
অন্যদিকে, কানাডায় নিবন্ধিত এবং সিঙ্গাপুরে সদর দপ্তর থাকা ভ্যালিউরা এনার্জি থাইল্যান্ড উপসাগরে তেল অনুসন্ধান কার্যক্রমে যুক্ত। পাশাপাশি তুরস্কের স্থলভাগে থ্রেস অববাহিকার গভীর ও কম প্রবেশযোগ্য শিলাস্তরে আটকে থাকা গ্যাসের মজুত মূল্যায়নের একটি ব্লকেও প্রতিষ্ঠানটির অংশীদারত্ব রয়েছে।
নথি কেনা থেকে চূড়ান্ত দরপত্র—গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী ধাপ
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর তথ্য ও দরপত্রের নথি কেনা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধানের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এই আগ্রহ শেষ পর্যন্ত কতটি প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক দরপত্র জমা দেওয়ার সিদ্ধান্তে রূপ নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
৩০ নভেম্বর দরপত্র জমার সময়সীমাকে সামনে রেখে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা, অনুসন্ধান-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ এবং বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ বাড়লে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাময় ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

