মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশে নিট এফডিআই বেড়েছে ১২.৭৮ শতাংশ, বড় অবদান পুনর্বিনিয়োগে

এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৩৪৬.৯৪ মিলিয়ন ডলার, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের প্রবাহে দুর্বলতা

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৩৪৬ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে দেশে কার্যরত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য প্রান্তিকে নিট পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ৫৫ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ২৬০ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ব্যবসা করে অর্জিত মুনাফার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজ দেশে ফিরিয়ে না নিয়ে এ দেশেই পুনরায় বিনিয়োগ করছেন।

অর্থনীতিসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগ বৃদ্ধি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি আস্থার ইঙ্গিত দেয়। তবে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগের সামগ্রিক চিত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়েছে।

পুনর্বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশে নিট এফডিআই প্রবাহ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট প্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ২৬০ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দেশে রেখে পুনরায় বিনিয়োগ করায় বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে এ প্রবণতা বাংলাদেশের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগে কমেছে প্রবাহ

পুনর্বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হলেও নতুন ইক্যুইটি মূলধন বিনিয়োগে কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। আলোচ্য প্রান্তিকে নিট ইক্যুইটি মূলধন বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ কম।

বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ কমেছে ৮৫ শতাংশের বেশি

এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৬১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

এ সময়ে দেশে মোট ৩৩৩ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলারের আন্তঃকোম্পানি ঋণ এলেও আগের ঋণের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিশোধ করায় নিট প্রবাহ কমে যায়। ফলে মোট ঋণপ্রবাহের পরিমাণ এবং নিট প্রবাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ কমলেও আগের প্রান্তিকের চেয়ে বেশি

খাতভিত্তিক হিসাবে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বাইরের খাতে নিট এফডিআই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ২৮০ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট এফডিআই ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে আগের প্রান্তিকে এ খাতে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে আগের প্রান্তিকের তুলনায় অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট বিনিয়োগের প্রবাহ বেড়েছে।

নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এখনো চ্যালেঞ্জ: ইনভেস্ট বাংলাদেশ

ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে নিট এফডিআই বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক থাকায় নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখনো চ্যালেঞ্জের বিষয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আগে থেকেই বিনিয়োগ করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এটি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি তাদের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

১.৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন

নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বাংলাদেশে আরও বেশি ও মানসম্মত বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ চলছে। সম্প্রতি কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগের ঘোষণা আশাব্যঞ্জক।

তিনি জানান, ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিনিয়োগের ঘোষণা ও প্রস্তাবকে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করে নতুন কারখানা স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

২০২৮ সালের মধ্যে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের লক্ষ্য

অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন ও সেগুলোকে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান নাহিয়ান রহমান। তিনি বলেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে আটকে থাকা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পের উন্নয়নকাজ এখন এগোচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের উন্নয়নকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

এ অঞ্চলকে ঘিরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে। প্রকল্পটির উন্নয়ন সম্পন্ন হলে সেখানে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিনিয়োগের ঘোষণা বাস্তবায়নে গুরুত্ব

নাহিয়ান রহমান আরও বলেন, ইনভেস্ট বাংলাদেশের ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ পর্যন্ত নেওয়া উদ্যোগ, অর্জন এবং যেসব ক্ষেত্রে আরও কাজ করা প্রয়োজন, তা তুলে ধরা হয়েছে। ভবিষ্যতেও কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য জানানো হবে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগ, নতুন কারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়াই এখন মূল লক্ষ্য। এ জন্য বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান এবং সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন