রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৩ ডলারে; তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তায় উদ্বেগ কাটেনি
প্রান্তকাল ডেস্ক | আন্তর্জাতিক | ১২ অক্টোবর ২০২৬
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঘোষণায় রাশিয়া থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে সোমবার (১২ অক্টোবর) এশিয়ার বাজারে তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়।
তবে এটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ অবসানের ঘোষণা নয়। দুই দেশের জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মস্কো ও কিয়েভের পক্ষ থেকে এ সমঝোতা কার্যকরের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা ৫৪ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৫৪ ডলার বা ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ১০৩ দশমিক ১৮ ডলারে দাঁড়ায়।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৫৪ ডলার বা ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৩১ ডলারে নেমে আসে।
রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল চুক্তির প্রভাব
গত শুক্রবার রাশিয়ার সঙ্গে বড় পরিসরে ডিজেল সরবরাহের চুক্তির কথা জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করবে।
এ ছাড়া নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ মেট্রিক টন এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি বৃদ্ধির এ সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহসংকট কিছুটা কমাতে পারে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকেরা।
এর প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও দরপতন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আইসিই গ্যাস অয়েল ফিউচারসের দাম প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা, তবে নিশ্চিত করেনি দুই পক্ষ
রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে।
তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফলে ঘোষিত সমঝোতা কতটা কার্যকর হবে এবং কত দিন স্থায়ী থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ হলে রাশিয়ার তেল পরিশোধন ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন কমতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির প্রাপ্যতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাস্তবে সরবরাহ না বাড়া পর্যন্ত শুধু ঘোষণার ভিত্তিতে তেলের দামে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এখনো চাপে বিশ্ববাজার
রাশিয়া-ইউক্রেনের সম্ভাব্য জ্বালানি যুদ্ধবিরতি আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি আনলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত, সৌদি আরবে হুতি হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে তেলের দাম কিছুটা কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের জন্য আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প খাতের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়তা মিলতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেই বাংলাদেশের খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম তাৎক্ষণিকভাবে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আমদানি চুক্তি, পরিশোধিত জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং সরকারের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির ওপর এর প্রভাব নির্ভর করবে।
সামনে কোন দিকে যাবে তেলের বাজার?
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরবর্তী গতিপথ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে—রাশিয়া-ইউক্রেনের ঘোষিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন, রাশিয়ার অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া থেকে সরবরাহ বাড়লে তেলের দামে আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হলে দাম আবারও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ফলে সোমবারের দরপতন বিশ্ববাজারে সাময়িক স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল হওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র: রয়টার্স

