খালাসের দীর্ঘসূত্রতায় বাড়ছে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ, দায় নিয়ে কাস্টমস ও ব্যবসায়ীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
দেশের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। বন্দরে আমদানি করা পণ্য খালাস করতে গড়ে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা সময় লাগছে। এতে আমদানিকারকদের ডেমারেজ মাশুল, ব্যাংকঋণের সুদ, পণ্য সংরক্ষণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের বিক্রয়মূল্যে যুক্ত হয়ে সাধারণ ভোক্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাম্প্রতিক ‘টাইম রিলিজ স্টাডি’ (টিআরএস) অনুযায়ী, পণ্য খালাসের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে দেশের অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুত করা একটি খসড়া দলিল পর্যালোচনায় এ ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায় গতি আনা জরুরি। তবে এই দীর্ঘসূত্রতার জন্য কাস্টমসের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, আমদানিকারকদের প্রস্তুতি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা কতটা দায়ী, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
ডেমারেজেই বাড়ছে আমদানি ব্যয়
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সমীক্ষা অনুযায়ী, বন্দরে পণ্য খালাসের দীর্ঘ সময় আমদানিকারকদের জন্য বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি করছে। কনটেইনার নির্ধারিত বিনামূল্যের সময়সীমার মধ্যে খালাস না হলে আমদানিকারকদের ডেমারেজ বা বিলম্বজনিত মাশুল দিতে হয়।
প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম চার দিন বিনামূল্যে কনটেইনার রাখার পরবর্তী প্রথম সাত দিনের জন্য প্রতি টিইইউ (২০ ফুট) কনটেইনারে দৈনিক ৬ দশমিক ৯০ ডলার মাশুল দিতে হয়। এ হিসাবে সাত দিনের ডেমারেজ দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৩০ ডলার। প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য প্রায় ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা ধরে এর পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৯৬৫ টাকা। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৮৬০ টাকা।
এই হিসাবের বাইরে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আমদানিকারকদের আরও নানা ধরনের ব্যয় বহন করতে হয়। পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি সময়মতো কারখানায় পৌঁছায় না। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে। একই সঙ্গে বন্দরে পণ্য আটকে থাকায় আমদানিকারকদের চলতি মূলধনের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে থাকে।
আমদানিকারক ইয়াসির আরাফাত বলেন, পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে শুধু ডেমারেজ মাশুলই বাড়ে না, প্রতিদিনের বিলম্বের জন্য ব্যাংকঋণের সুদও বাড়তে থাকে। এতে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যায়।
ভোক্তার ওপরও পড়ছে বাড়তি ব্যয়ের চাপ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, কাস্টমস ও বন্দরের কার্যক্রমে বিলম্বের কারণে আমদানিকারকদের যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়, তা তাঁরা সাধারণত পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। ফলে শেষ পর্যন্ত এই ব্যয়ের ভার বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের।
তাঁর মতে, আমদানি পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তা বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ খালাসে বিলম্ব হলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। এর প্রভাব সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায় পেরিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বন্দরকেন্দ্রিক এই ব্যয় শুধু আমদানিনির্ভর ব্যবসার মুনাফা কমায় না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকেও দুর্বল করে। কারণ, পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো পাওয়া না গেলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয় এবং ক্রেতার কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
খালাসের সময়ের ৭৫ শতাংশ ব্যয় আমদানিকারকদের প্রক্রিয়ায়
চট্টগ্রাম কাস্টমসের টিআরএসে পণ্য খালাসের বিভিন্ন ধাপের সময় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয় আমদানিকারক ও তাঁদের নিয়োজিত কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের কার্যক্রমে।
সমীক্ষা অনুযায়ী, পণ্য খালাসের মোট সময়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে ব্যয় হয় ১৪ শতাংশ সময়। কাস্টমস হাউসের মূল্যায়ন বা শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় লাগে ৮ শতাংশ। অন্যান্য সরকারি সেবা ও সনদ প্রদানকারী সংস্থার কার্যক্রমে ব্যয় হয় ২ শতাংশ এবং শিপিং এজেন্টদের প্রক্রিয়ায় লাগে ১ শতাংশ সময়।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, কাস্টমসে আনুষ্ঠানিকভাবে বিল অব এন্ট্রি জমা দেওয়ার আগেই পণ্য খালাসের মোট সময়ের একটি বড় অংশ পার হয়ে যায়। এ সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক কাগজপত্র প্রস্তুত, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মধ্যে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র সংগ্রহ এবং লেটার অব ইনডেমনিটি-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।
জাহাজ বন্দরে আসার পর থেকে কাস্টমসের শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের অন্যান্য প্রক্রিয়ায় বাকি প্রায় ৫ দশমিক ৮ দিন ব্যয় হয় বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই হিসাব নিয়ে কাস্টমস এজেন্টদের আপত্তি রয়েছে। তাঁদের মতে, খালাসের সময় গণনার ক্ষেত্রে আমদানির সাধারণ ঘোষণা বা ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) দাখিলের সময়কে সূচনা হিসেবে ধরা হলে প্রকৃত খালাস-সময়ের চিত্র যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
সময় গণনার পদ্ধতি নিয়ে কাস্টমস ও এজেন্টদের মতভেদ
কাস্টমস এজেন্টদের দাবি, শিপিং এজেন্টরা অনেক ক্ষেত্রেই জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশের আগেই আইজিএম দাখিল করেন। এ নথিতে জাহাজে পরিবহন করা পণ্যের বিবরণ থাকে। অন্যদিকে, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা সাধারণত জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর পর বিল অব এন্ট্রি দাখিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
এ কারণে আইজিএম দাখিলের সময় থেকে পণ্য খালাসের সময় গণনা করা হলে জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগের সময়ও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তাঁদের মতে, পণ্য খালাসের প্রকৃত সময় নির্ধারণে বন্দরে পণ্য নামানোর বা ল্যান্ডিংয়ের সময়কে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত আলী বলেন, পণ্য খালাসের সময়সীমা আইজিএম দাখিল থেকে নয়, বরং পণ্য বন্দরে নামার পর থেকে গণনা করা উচিত।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই জাহাজ সমুদ্রে থাকা অবস্থাতেই তাঁরা বিল অব এন্ট্রি-সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করে রাখেন। ফলে আইজিএম দাখিলের সময় থেকে হিসাব শুরু করলে পণ্য খালাসের প্রকৃত সময় প্রতিফলিত হয় না।
কাস্টমস এজেন্টদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে সময় গণনা করায় সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার বিলম্বের দায় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ওপর বেশি করে বর্তায়। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মোট সময়ের বড় অংশ আমদানিকারক ও তাঁদের প্রতিনিধিদের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেই ব্যয় হয়।
কাস্টমসের দাবি, শুল্কায়ন হচ্ছে দ্রুত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে সম্প্রতি পাঠানো এক চিঠিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মাহবুবুর রহমান দাবি করেছেন, কাস্টমস হাউসের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক দ্রুত হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে জমা পড়া বিল অব এন্ট্রির প্রায় ৭৭ শতাংশ চালানের শুল্কায়ন এক দিনের মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে। আর ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ চালানের শুল্কায়ন শেষ হচ্ছে তিন দিনের মধ্যে।
কমিশনারের মতে, আইজিএম দাখিল থেকে শুরু করে বিল অব এন্ট্রি জমা, শুল্ক ও কর পরিশোধ এবং চূড়ান্তভাবে পণ্য ডেলিভারি নেওয়া পর্যন্ত মোট সময়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি ব্যয় করেন আমদানিকারক কিংবা তাঁদের প্রতিনিধিরা।
বিশ্ব কাস্টমস সংস্থার (ডব্লিউসিও) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও হিসাবপদ্ধতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পণ্য খালাসের মোট সময়ের প্রায় ৮ শতাংশ কাস্টমসের প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয়। বিপরীতে, আমদানিকারক ও তাঁদের নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেই ৭৫ শতাংশের বেশি সময় পার হয়ে যায়।
তবে সামগ্রিক খালাস প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে শুধু কাস্টমসের শুল্কায়ন দ্রুত করাই যথেষ্ট নয়। বন্দরের বিভিন্ন সেবা, আমদানিকারকদের নথিপত্র প্রস্তুতি, অর্থ পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর অনুমোদনপ্রক্রিয়াও সমন্বিতভাবে দ্রুত করার প্রয়োজন রয়েছে।
যন্ত্রপাতি খালাসে সবচেয়ে বেশি সময়
টিআরএসের তথ্য অনুযায়ী, পণ্যের ধরনভেদে খালাসের সময়েও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি খালাসে গড়ে ১৩ দশমিক ৩ দিন সময় লাগে। খেলনার মতো বাণিজ্যিক পণ্য খালাসে সময় লাগে গড়ে ১১ দশমিক ৬ দিন এবং খাদ্যপণ্য খালাসে ১১ দশমিক ১ দিন।
যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার চিত্র আরও স্পষ্ট। সমীক্ষা অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি খালাসে মোট ১৩ দশমিক ৩ দিনের মধ্যে ৭ দশমিক ৫ দিন ব্যয় হয় শিপিং এজেন্টের আইজিএম দাখিল এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিল অব এন্ট্রি জমা দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে।
অর্থাৎ, কাস্টমসে আনুষ্ঠানিকভাবে পণ্যের ঘোষণা দেওয়ার আগেই মোট খালাস-সময়ের ৫৬ শতাংশের বেশি পার হয়ে যায়।
শিল্পকারখানার জন্য আমদানি করা মূলধনী যন্ত্রপাতি সময়মতো খালাস না হলে নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান কারখানার আধুনিকায়ন কার্যক্রম বিলম্বিত হতে পারে। যন্ত্রপাতির পাশাপাশি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আটকে থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন পরিকল্পনা ও সরবরাহব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ পরিস্থিতিতে বন্দরের কার্যক্রমের পাশাপাশি জাহাজ আসার আগেই আমদানিসংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত ও শুল্কায়নের ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কায়িক পরীক্ষার চেয়ে নথিপত্র ও আনুষ্ঠানিকতার বিলম্ব বড়
সমীক্ষায় দেখা গেছে, কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষা বা ফিজিক্যাল ইন্সপেকশন পণ্য খালাসে বিলম্বের একমাত্র কিংবা প্রধান কারণ নয়। কায়িক পরীক্ষার জন্য রেড চ্যানেলে পাঠানো পণ্য খালাসে গড়ে ১৯ দিন ২৩ ঘণ্টা সময় লাগলেও মোট আমদানির মাত্র ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ চালান এ চ্যানেলে যায়।
অন্যদিকে, মোট আমদানির ৯১ দশমিক ০১ শতাংশ চালান ইয়েলো চ্যানেলে নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়। এসব চালান খালাস করতেও গড়ে ১০ দিন ২০ ঘণ্টা সময় লাগছে।
কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঝুঁকিভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে কায়িক পরীক্ষার পরিধি কমিয়ে আনা হয়েছে। তাঁদের দাবি, বর্তমানে মোট চালানের মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ কায়িক পরীক্ষার আওতায় আসে এবং বাকি ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ চালান নথিপত্র যাচাইয়ের পর খালাস দেওয়া হয়।
এমনকি সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানি করা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি পর্যালোচনার পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চালান সরাসরি ছাড় দেওয়া হয় বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাস্টমস ২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩২টি কনটেইনার স্ক্যান করেছে। এর মধ্যে ১৯৯টি কনটেইনারে সন্দেহজনক বিষয় শনাক্ত হয়। পরবর্তী কায়িক পরীক্ষায় ৮১টি কনটেইনারে অনিয়ম পাওয়া যায়।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পণ্য খালাসের সময় কমাতে নিরাপত্তা ও রাজস্ব সুরক্ষা বজায় রেখেই নথিপত্র যাচাই, ঝুঁকি নির্ধারণ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
কাস্টমস আইনের পাঁচ দিনের বিধান কার্যকরের দাবি
পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৮৪ ধারায় উল্লেখিত পাঁচ দিনের সময়সীমা কার্যকরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার।
এই ধারায় পণ্য বন্দরে খালাসের পর পাঁচ দিনের মধ্যে আমদানির ঘোষণাপত্র দাখিলের নির্দেশনা রয়েছে। তবে এ বিধান বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগপদ্ধতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কমিশনারের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানির ঘোষণা দাখিল নিশ্চিত করা গেলে পণ্য খালাসের প্রাথমিক পর্যায়ের দীর্ঘসূত্রতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আমদানিকারক ও তাঁদের প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত এবং শুল্কায়নের জন্য আগাম ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করা যাবে।
তবে এ ধরনের সময়সীমা কার্যকর করতে হলে আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র, ব্যাংকিং কার্যক্রম ও অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব থাকলে শুধু আইনি সময়সীমা নির্ধারণ করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
আগের গবেষণাতেও উঠে এসেছিল একই চিত্র
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাম্প্রতিক টিআরএসের ফলাফলের সঙ্গে ২০২২ সালে এনবিআরের পরিচালিত আগের গবেষণারও উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। বিশ্ব কাস্টমস সংস্থার পদ্ধতি অনুসরণে পরিচালিত ওই গবেষণায় চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে গড়ে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা ২৩ মিনিট সময় লাগার তথ্য উঠে এসেছিল।
সেই গবেষণায় দেখা যায়, মোট খালাস-সময়ের ৭২ থেকে ৭৮ শতাংশ ব্যয় হয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার কাজে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণ ও শুল্কায়নের ব্যবস্থা চালু করা গেলে পণ্য খালাসের মোট সময় অন্তত ৫৭ শতাংশ কমানো সম্ভব।
বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং চালু করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এ ব্যবস্থায় জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই আমদানিসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই এবং শুল্কায়নের বড় অংশ সম্পন্ন করা যাবে।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি খালাসের ক্ষেত্রে বর্তমানে মোট ১৩ দশমিক ৩ দিনের মধ্যে ৯ দশমিক ৪ দিনের প্রাক-প্রশাসনিক কাজ আগেই সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে জাহাজ বন্দরে ভেড়ার পর মূলত শুল্ক পরিশোধ ও পণ্য ডেলিভারির কাজ বাকি থাকবে। ফলে যন্ত্রপাতি খালাসের সময় ১৩ দশমিক ৩ দিন থেকে কমে ৩ দশমিক ৯ দিনে নেমে আসতে পারে।
প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সুপারিশ
পণ্য খালাসের সময় কমাতে সাম্প্রতিক সমীক্ষা ও আগের গবেষণায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, কাস্টমস আইনের ৮৪ ধারার অধীনে জাহাজ আসার আগেই আমদানিসংক্রান্ত নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণ বা প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং বাধ্যতামূলক করা।
এ ছাড়া বর্তমানে মাত্র ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ‘অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর’ (এইও) নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজতর ও দ্রুততর কাস্টমস-সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, ম্যানিফেস্ট নিবন্ধনের পরপরই আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল নোটিফিকেশন পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত, বিল অব এন্ট্রি দাখিল এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা যথাসময়ে সম্পন্ন করা সহজ হবে।
অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—একটি পৃথক নিলাম কমিশনারেট গঠন, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ই-অকশন প্ল্যাটফর্ম চালু, ক্ষতিকর পণ্য ধ্বংসের জন্য বিশেষায়িত ইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা এবং কাস্টমস নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যাংকিং তথ্যের সরাসরি অনলাইন সংযোগ স্থাপন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে পণ্য খালাসের বিভিন্ন ধাপে অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষা কমবে, নথিপত্র যাচাই ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্ষমতা বাড়বে।
সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর চট্টগ্রাম চেম্বারের
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, পণ্য খালাসে বিলম্বের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করতে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং এনবিআরের উচিত সব অংশীজনকে নিয়ে একসঙ্গে বসে দ্রুত একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে বের করা।
তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমদানির ঘোষণা, নথিপত্র প্রস্তুতি, শুল্কায়ন, অর্থ পরিশোধ, বন্দর থেকে পণ্য ছাড় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন—সব ধাপের সঙ্গে একাধিক পক্ষ জড়িত। ফলে কোনো একটি পর্যায়ে গতি বাড়লেও অন্য পর্যায়ে বিলম্ব থাকলে সামগ্রিক খালাস-সময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বারে সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ
দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দর ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যব্যবস্থার মাধ্যমে। জাতীয় রাজস্ব আদায়েও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আদায় ছিল ৬ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৮১ হাজার ৪৭১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগের অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৭৬ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা।
বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস দৈনিক গড়ে ২ হাজার ২০৫টি আমদানি বিল অব এন্ট্রি প্রক্রিয়াকরণ করে প্রায় ২২৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর বছরে প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনা করে। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার মানুষ সরাসরি বন্দরের সেবা গ্রহণ করেন।
বাণিজ্যের এই বিপুল চাপ সামলাতে বন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান প্রক্রিয়াগুলোকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাঁদের মতে, পণ্য খালাসের সময় কমানো গেলে আমদানিকারকদের পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি দ্রুত কারখানায় পৌঁছাবে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে গতি আসবে। একই সঙ্গে বন্দরে কনটেইনারের অপ্রয়োজনীয় অবস্থান কমলে বিদ্যমান অবকাঠামো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা দূর করার জন্য তাই শুধু দায় নির্ধারণ নয়, বরং সময় গণনার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নির্ধারণ, প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং চালু, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বারের কার্যকারিতা বাড়ানো গেলে তা আমদানি ব্যয় কমানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

