জ্বালানি ভর্তুকি ও অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে তিন বছরে বাড়তি অর্থায়নের প্রস্তাব, আইএমএফের ঋণশর্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা
জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের প্রথম দিনে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে তিন বছরের কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে। নতুন এই কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের সার্বিক সহযোগিতা, অর্থায়নের সম্ভাব্য ক্ষেত্র এবং অতিরিক্ত ঋণ সহায়তার রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে অতিরিক্ত ঋণ হিসেবে ঠিক কত অর্থ চাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক প্রকাশ করেননি।
বৈঠকে উপস্থিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে।
জ্বালানি ভর্তুকির বাড়তি ব্যয় সামলাতে সহায়তা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে সরকারের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশেও তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর ফলে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়ছে। এই বাড়তি ব্যয় মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে আগামী দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি সুরক্ষাবলয় তৈরিতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা করবে। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির সঙ্গে কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার ক্ষেত্র ও কাঠামো নির্ধারিত হবে।
ওয়াশিংটনের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা
বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকেও নতুন ঋণ সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ সরকার। প্রস্তাবিত ৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্তগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়নের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার বিষয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে ঋণের শর্তগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব।
আইএমএফের সংস্কার শর্ত বাস্তবায়ন কঠিন হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু নির্দিষ্ট শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো পরিমার্জন করা সম্ভব। একসঙ্গে অনেকগুলো সংস্কার চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ঋণের শর্ত নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আরও দুই দিন বৈঠক চলবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিকল্পনার বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য নেই বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান করা সম্ভব।
এর আগে আইএমএফের সঙ্গে অনুমোদিত ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির সংস্কারসংক্রান্ত কঠোর শর্ত নিয়ে মতভেদের কারণে বাংলাদেশ ওই কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই কর্মসূচির আওতায় আনুমানিক ৩.৬ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার পর তা স্থগিত করে নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কারগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের শর্তে আইএমএফের কাছ থেকে নতুন করে ৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের পৃথক ঋণ প্যাকেজ পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
ব্যাংক খাত পুনর্মূলধনীকরণে আইএফসির আগ্রহ
দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ ও আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগেও আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের পুনর্মূলধনীকরণ বা রিক্যাপিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় সহায়তা দিতে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি ইক্যুইটি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান জানান, ব্যাংক খাতের পুঞ্জীভূত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ থেকে আট বছর জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর অন্তত ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে।
এত বিপুল অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতিমধ্যে এ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ রেখেছে। তবে শুধু সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনের পুরো ব্যয় মেটানো কঠিন হবে।
ব্যাংকে আমানত ফিরছে বলে দাবি অর্থমন্ত্রীর
ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, আমানতকারীদের মধ্যে আগে যে ভীতি তৈরি হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকে আমানত ফিরছে এবং নিট আমানতের পরিমাণ বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক ধারা ফিরে আসছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আবার বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তবে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের লোকসান, মূলধন ঘাটতি এবং পুনর্মূলধনীকরণের সম্ভাব্য বিপুল ব্যয় মোকাবিলায় সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের অগ্রগতির ওপর।
বিশ্বব্যাংকের নতুন ‘ফিলানথ্রপি হাব’ চালু
এদিকে বৈশ্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যক্তি, দাতব্য সংস্থা ও বেসরকারি খাতের অর্থ, অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগাতে ‘ফিলানথ্রপি হাব’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্ভাবনী ধারণা ও পরীক্ষামূলক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বৃহত্তর পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে টেকসই স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে এশিয়ান ভেঞ্চার ফিলানথ্রপি নেটওয়ার্ক (এভিপিএন) এবং টেমাসেক ট্রাস্টের সঙ্গে পৃথক সমঝোতা স্মারক সই করেছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মতে, সরকারি সম্পদের ওপর বৈশ্বিক উন্নয়ন চাহিদার চাপ বাড়তে থাকায় বেসরকারি ও দাতব্য খাতের অর্থায়ন, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতাকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন প্ল্যাটফর্মটি এসব সম্পদকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি ভর্তুকির চাপ, ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ এবং আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা—দুটিই সরকারের এই প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রস্তাবিত অর্থায়নের চূড়ান্ত পরিমাণ, শর্ত এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারিত হওয়ার পরই এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা স্বস্তি আনতে পারবে, তা স্পষ্ট হবে।

