তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেইয়ের একটি গে বারে পুলিশের অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের প্রায় ১০০ জন সদস্য। শনিবার ওয়ানহুয়া এলাকার ‘কমান্ডার ডি’ নামের ওই বারে অভিযান চালিয়ে ৫১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ। একই ঘটনায় বারটির মালিককেও গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার দুপুরে অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীরা সংশ্লিষ্ট পুলিশ স্টেশনের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
তাইওয়ান এশিয়ার অন্যতম উদারপন্থী সমাজ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সমতার প্রশ্নে অঞ্চলটির অন্য অনেক দেশের তুলনায় তাইওয়ান অগ্রগামী। ২০১৯ সালে দেশটিতে সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধতা পায়, যা এশিয়ায় প্রথম। এমন প্রেক্ষাপটে একটি গে বারে পুলিশের অভিযান এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
কী ঘটেছিল বারে?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার দুপুরে তাইপেইয়ের ওয়ানহুয়া এলাকার ‘কমান্ডার ডি’ বারে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের মুখপাত্র চেন ইউ-চেন রয়টার্সকে জানান, ‘জনসমক্ষে নৈতিকতা ভঙ্গের’ অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতের তল্লাশি পরোয়ানা নিয়ে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তিনি বলেন, আটক ৫১ জনের বিরুদ্ধে অশালীন আচরণের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের দাবি, তাঁরা প্রকাশ্যে কিংবা সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে এমন স্থানে নগ্ন শরীর প্রদর্শন করছিলেন। তাইপেই নগর কর্তৃপক্ষও পুলিশের পৃথক একটি বিজ্ঞপ্তির কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে বারটিতে অশালীন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। বারটির মালিকের বক্তব্য জানতে রয়টার্স যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযানের প্রতিবাদে বিক্ষোভ
রোববার দুপুরে প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল নিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ স্টেশনের দিকে যান। সেখানে তাঁরা পুলিশের অভিযানের প্রতিবাদ জানান এবং আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অভিযানের সময় বারে উপস্থিত ছিলেন ‘ওয়েন’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি। রয়টার্সকে তিনি বলেন, পুলিশ অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে বারে অভিযান চালায়, যা তাঁর কাছে ভীতিকর অভিজ্ঞতা ছিল।
বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ ফাঁড়ির প্রধান। তিনি নিজের নাম প্রকাশ না করে বলেন, বহুমাত্রিক সমাজের সংস্কৃতির প্রতি পুলিশ শ্রদ্ধাশীল এবং প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে পুলিশের এই বক্তব্যে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। তাঁদের মতে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযানের ধরন নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তোলেন।
প্রাইড মাসে অভিযান, বাড়ছে ক্ষোভ
চলতি মাসের শেষ দিকে তাইপেইয়ে বার্ষিক প্রাইড র্যালি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই আয়োজন এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের অধিকার, সমতা এবং সামাজিক স্বীকৃতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
এমন সময়ে গে বারে পুলিশের অভিযানকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। বিক্ষোভকারী কাং ইয়াং বলেন, তাইপেই দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সমকামী ও যৌন সংখ্যালঘুদের জন্য সহনশীল শহর হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এই অভিযান সেই ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তাঁর মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, শহরটি নিজেদের সমকামীবান্ধব হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসায় এ ধরনের ঘটনা মেনে নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন।
বিক্ষোভকারীদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে শুধু একটি বারে অভিযান নয়, বরং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যৌন পরিচয়ের কারণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্নও।
এলজিবিটিকিউ+ অধিকারে তাইওয়ানের অবস্থান
তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ায় এলজিবিটিকিউ অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০১৯ সালে সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধ করার মধ্য দিয়ে দেশটি এশিয়ায় একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এরপর থেকে তাইপেইয়ের প্রাইড র্যালিসহ বিভিন্ন আয়োজন যৌন সংখ্যালঘুদের দৃশ্যমানতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
তবে আইনগত স্বীকৃতি থাকলেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতা নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাম্প্রতিক অভিযান সেই বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
তাইপেইয়ের মেয়র চিয়াং ওয়ান-আন বিরোধী দল কুওমিনতাংয়ের নেতা। তিনি এর আগে তাইপেই প্রাইড অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন এবং এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে পুলিশের এই অভিযান নগর প্রশাসনের অবস্থান এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বিষয়েও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে মেয়রের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট অভিযান নিয়ে কোনো বক্তব্যের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অতীতের সামাজিক বাস্তবতা ও বর্তমান বিতর্ক
১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তাইওয়ানে সামরিক শাসন চালু ছিল। ওই সময়ে সমকামী সম্পর্ক সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ ও ব্যাপকভাবে অগ্রহণযোগ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, নাগরিক আন্দোলন এবং অধিকারভিত্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশটিতে যৌন সংখ্যালঘুদের অবস্থানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।
বর্তমানে তাইওয়ানকে এশিয়ায় এলজিবিটিকিউ অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়েছে, অধিকার ও সামাজিক সহনশীলতার প্রশ্নে বিতর্ক এখনো রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব যেমন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করা, তেমনি অভিযানের প্রতিটি পর্যায়ে নাগরিকদের মর্যাদা, গোপনীয়তা ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, তাইপেইয়ের গে বারে পুলিশের অভিযান এবং এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ তাইওয়ানে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। অভিযানের অভিযোগগুলোর তদন্ত এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে আরও তথ্য প্রকাশিত হলে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

