রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

ইউক্রেনে ভারতীয় মালিকানাধীন ওষুধ কারখানায় রুশ হামলা, ক্ষতি ৪০০ কোটি রুপি

ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি এলাকায় ভারতীয় মালিকানাধীন ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কুসুম গ্রুপের একটি কারখানায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এতে কারখানাটির মূল ভবনের বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রাথমিক হিসাবে হামলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি ভারতীয় রুপি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এবং হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিহত ব্যক্তির পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সুমির একটি বেসামরিক ওষুধের গুদামেও রুশ ড্রোন আঘাত হানে। একই দিনে রাজধানী কিয়েভের পিভনিচনি ব্রিজ এবং ডিনিপ্রোর একটি যোগাযোগকেন্দ্রেও হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় মোট ছয়জন আহত হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ধ্বংস কারখানার বড় অংশ, আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী

হামলার পর প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে কারখানা এলাকায় ব্যাপক ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোন হামলার আঘাতে কারখানাটির মূল ভবনের বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

কুসুম গ্রুপের সুমি কারখানাটি ইউক্রেনে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালেও কারখানাটির কার্যক্রম চালু ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক হামলায় স্থাপনাটির ক্ষয়ক্ষতি প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

হামলায় প্রায় ৪০০ কোটি ভারতীয় রুপির ক্ষতির যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেটি প্রাথমিক অনুমান। ভবন, যন্ত্রপাতি, উৎপাদনসামগ্রী ও মজুত ওষুধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন সম্পন্ন হলে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও স্পষ্ট হতে পারে।

জেলেনস্কির নিন্দা, বেসামরিক স্থাপনায় হামলার অভিযোগ

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় সুমি, কিয়েভ ও ডিনিপ্রোতে হামলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রুশ বাহিনী কিয়েভের পিভনিচনি ব্রিজে আবারও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি সুমির একটি বেসামরিক ওষুধের গুদাম এবং ডিনিপ্রোর একটি যোগাযোগকেন্দ্রেও আঘাত হেনেছে।

সুমির হামলায় একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় শোক প্রকাশ করে জেলেনস্কি নিহত ব্যক্তির পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দিনের বিভিন্ন হামলায় মোট ছয়জন আহত হয়েছেন।

ইউক্রেনের অভিযোগ, রুশ বাহিনীর ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে সুমি এলাকার এই নির্দিষ্ট হামলার লক্ষ্য ও সামরিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাশিয়ার পক্ষ থেকে কী বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

ভারতীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কুসুম গ্রুপের পরিচিতি

কুসুম গ্রুপ ১৯৯৪ সালে ইউক্রেনে ভারতীয় ওষুধ রপ্তানিকারক ও পরিবেশক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ব্র্যান্ডের ওষুধ বিপণন এবং উৎপাদনে প্রবেশ করে। ২০০২ সালে নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারজাত শুরু করার পর প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ভারতে এবং ২০০৯ সালে ইউক্রেনের সুমি এলাকায় কারখানা স্থাপন করে কুসুম গ্রুপ। বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক রাজীব গুপ্ত প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোম্পানিটি নিজেদের ‘ভারতীয় মূলের ইউক্রেনীয় কোম্পানি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটি মূলত ৫০টিরও বেশি জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুত করে। এসব পণ্য ইউক্রেনের পাশাপাশি উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, ফিলিপাইনসহ নয়টিরও বেশি দেশের বাজারে বিক্রি করা হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনের ওষুধশিল্পে কার্যক্রম চালিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানটির সুমি কারখানায় হামলা তাই শুধু একটি শিল্পস্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নয়; এর প্রভাব উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ওষুধ সরবরাহের ওপরও পড়তে পারে। তবে উৎপাদন কত দিন বন্ধ থাকতে পারে, কতজন কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিংবা বিভিন্ন দেশে ওষুধ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটবে কি না—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুদ্ধের মধ্যে শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থায় বাড়ছে ঝুঁকি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি, পরিবহন, যোগাযোগ ও শিল্প অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ওষুধ কারখানার মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রে হামলা হলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধের সরবরাহব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

বিশেষ করে কোনো কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হলে নির্দিষ্ট ওষুধের মজুত ও বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কুসুম গ্রুপের সুমি কারখানার উৎপাদনক্ষমতা, বর্তমান মজুত এবং বিকল্প উৎপাদনব্যবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় এ হামলার ফলে বাজারে ওষুধের ঘাটতি দেখা দেবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

শাহেদ ড্রোন হামলা ও ইউক্রেনের পাল্টা সক্ষমতা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ইউক্রেনে দ্রুতগতির ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল জেটচালিত শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে হামলা বাড়িয়েছে। এসব ড্রোন প্রতিহত করতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। ইউক্রেনের কিছু ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের গতি তুলনামূলক কম হওয়ায় দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তু ঠেকানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ইউক্রেন চলতি সপ্তাহে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এফপি-৭ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম সফল ব্যবহারের কথা ঘোষণা করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর ব্যবহার, কার্যকারিতা ও যুদ্ধক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নেই।

রাশিয়ার ড্রোন হামলা এবং ইউক্রেনের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে চলমান সামরিক প্রতিযোগিতারই অংশ। এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পস্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

সামনে কী প্রভাব পড়তে পারে?

কুসুম গ্রুপের সুমি কারখানায় হামলার তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা এবং স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা সামনে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বন্ধ থাকা, যন্ত্রপাতি পুনর্নির্মাণ, মজুত পণ্যের ক্ষতি এবং সরবরাহব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের মতো চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও বিস্তারিত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ইউক্রেনের সুমি এলাকায় ভারতীয় মালিকানাধীন কুসুম গ্রুপের ওষুধ কারখানায় রুশ ড্রোন হামলা চলমান যুদ্ধের মধ্যে শিল্প অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্তত একজনের প্রাণহানি ও কারখানার বড় অংশ ধ্বংস হওয়ার খবরের পাশাপাশি প্রায় ৪০০ কোটি রুপির ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব ঘটনাটির ব্যাপকতা তুলে ধরছে। তবে হামলার পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতি, কারখানার উৎপাদন পুনরায় চালুর সময় এবং ওষুধ সরবরাহে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন