রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

মালয়েশিয়া থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ফিরলেন প্রায় দেড় হাজার অভিবাসী, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা না থাকা এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই মালয়েশিয়া থেকে প্রায় দেড় হাজার মিয়ানমারের অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাবাসন ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। বিশেষ করে দেশে ফেরার পর তাঁদের নিরাপত্তা, সম্ভাব্য নিপীড়ন এবং জোরপূর্বক সামরিক বাহিনী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের আশঙ্কা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।

এএফপির সাংবাদিকেরা জানিয়েছেন, মিয়ানমার নৌবাহিনীর জাহাজে করে প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিরা ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের থানলিন নৌঘাঁটিতে পৌঁছান। পরে তাঁদের একটি অংশকে বাসে করে অভিবাসন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি বৌদ্ধ মঠের হলঘরে নেওয়া হয়। প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া চলাকালে নৌঘাঁটির বাইরে স্বজনদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তবে পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি।

মালয়েশিয়ার একটি কফির দোকানে কাজ করতেন ৫৩ বছর বয়সী কিয়াও সোয়ার থেইন। সেখানে গ্রেপ্তারের পর তিনি এক বছর আট মাস আটক ছিলেন। দেশে ফেরার পরও পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে না পারার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখনো পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি।’

দীর্ঘদিন আটক থাকার সময় খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। দেশে ফেরার পেছনে এটিও একটি কারণ ছিল। তবে প্রত্যাবাসনের পর ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অন্যদের সঙ্গে মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা অবস্থায় তিনি বলেন, ‘আমি কোনো কিছুই আশা করি না।’

নৌঘাঁটির বাইরে স্বজনদের অপেক্ষা, তবু অনিশ্চয়তা

রোববার ভোরে কয়েক শ পরিবারের সদস্য গাড়ি নিয়ে থানলিন নৌঘাঁটির বাইরে জড়ো হন। তাঁদের কেউ হাতে স্বজনদের ছবি, কেউবা কাগজে লেখা নাম তুলে ধরে অপেক্ষা করছিলেন। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আশায় সেখানে এসেছিলেন তাঁরা।

কিছু পরিবারকে নৌঘাঁটির ফটক পেরিয়ে স্বজনদের স্বাগত জানানোর অনুমতি দেওয়া হলেও অধিকাংশের তাৎক্ষণিকভাবে সাক্ষাতের আশা পূরণ হয়নি। এক নৌ কর্মকর্তা মেগাফোনে তাঁদের জানান, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের এখনই নিয়ে যাওয়া যাবে না। প্রথমে তাঁদের ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

এক নারী তাঁর ১৯ বছর বয়সী ভাইকে খুঁজতে নৌঘাঁটির বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। তিন মাস আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পরপরই তাঁর ভাই গ্রেপ্তার হন। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নারী জানান, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের তালিকায় ভাইয়ের নাম দেখলেও ভেতরে গিয়ে তাঁকে খুঁজে বের করার সুযোগ পাননি।

পরিবারগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন পর স্বজনেরা দেশে ফিরলেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পুনর্মিলনের সুযোগ নিশ্চিত না হওয়ায় অনিশ্চয়তা কাটছে না।

জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের আশঙ্কা

প্রত্যাবাসিতদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের অন্যতম কারণ মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটিতে সামরিক বাহিনী এবং বিভিন্ন সশস্ত্র প্রতিরোধ ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত চলছে। এ পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে নতুন করে সহিংসতা, নিপীড়ন কিংবা জোরপূর্বক নিয়োগের শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেক স্বজন।

৫৫ বছর বয়সী কিয়াও মিন্ট জানান, মালয়েশিয়ায় এক বছরের বেশি সময় আটক থাকা তাঁর তিন নাতি-নাতনিকে নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর আশঙ্কা, দেশে ফেরার পর তাঁদের মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কিংবা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে জোরপূর্বক নিয়োগ করা হতে পারে।

এই উদ্বেগ প্রত্যাবাসন কর্মসূচির মানবিক দিকটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ, যুদ্ধের মধ্যে ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং জীবিকা নির্বাহের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে তাঁদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রথম দফায় ফিরলেন ১ হাজার ৪৭৬ জন

মিয়ানমার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৪৭৬ জন অভিবাসীকে নিয়ে তিনটি নৌযান মালয়েশিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে। রোববার ভোরে মিয়ানমার নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ থানলিন নৌঘাঁটিতে পৌঁছায় বলে এক নৌ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার যে পাঁচ হাজার অভিবাসীকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে এটিই প্রথম দল। মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যাবাসিতদের অধিকাংশই পুরুষ। তাঁদের মধ্যে ২৭ শিশু ও ৭৯ জন নারী রয়েছেন।

তবে প্রত্যাবাসিতদের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে এএফপির প্রশ্নের জবাব দেয়নি মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। ফলে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে।

মালয়েশিয়া জানিয়েছে, আটককেন্দ্রে থাকা অভিবাসীরা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন। তবে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, দীর্ঘদিন আটক থাকা এবং বিকল্পের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের সম্মতি প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ

মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক দমন-পীড়নের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন। ওই দমন-পীড়নকে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ গণহত্যার শামিল বলে অভিহিত করেছেন।

মালয়েশিয়ায় মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ প্রত্যাবাসিত হয়ে থাকলে দেশে ফিরে নাগরিকত্বসংক্রান্ত জটিলতা, চলাচলে বিধিনিষেধ, বৈষম্য কিংবা নতুন করে নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে মানবাধিকার মহলে।

শরণার্থীদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের প্রতি বিদ্বেষ বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত জুলাইয়ে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার কথা জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসিতদের পরিচয়, তাঁদের আইনি অবস্থান এবং দেশে ফিরে কী ধরনের সুরক্ষা পাবেন, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় উদ্বেগ রয়ে গেছে।

প্রত্যাবাসনের স্বেচ্ছাসম্মতি নিয়ে প্রশ্ন

মিয়ানমার সরকারের দাবি, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিরা মালয়েশিয়ায় অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধে সাজা ভোগ করেছেন। অন্যদিকে, ফোর্টিফাই রাইটসের মতো মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রগুলোর কঠিন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করার জন্য গত সপ্তাহে তাদের কর্মীদের অভিবাসীদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের সম্মতিকে কতটা স্বেচ্ছামূলক হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, কাউকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো উচিত নয়, যেখানে তাঁর জীবন, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ফোর্টিফাই রাইটসের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ইয়াপ লাই শেং এএফপিকে বলেন, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের সঙ্গে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী কী আচরণ করবে, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তা রয়েছে।

দ্বিতীয় দফায় আরও সাড়ে তিন হাজার মানুষ ফেরানোর পরিকল্পনা

প্রথম দফার প্রত্যাবাসনের পর মালয়েশিয়া আরও তিন হাজার ৫০০-এর বেশি অভিবাসীকে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব অভিবাসী আর্থিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ তৈরি করছেন।

অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে আরও মানুষকে ফেরত পাঠানো হলে তাঁদের একটি অংশ পুনরায় সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হতে পারেন। তাই পরবর্তী প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের আগে প্রত্যেক ব্যক্তির পরিস্থিতি আলাদাভাবে মূল্যায়ন, ঝুঁকি যাচাই এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা দখলকারী নেতা মিন অং হ্লাইং এপ্রিলে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যাবাসন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি শিগগিরই মালয়েশিয়া সফর করতে পারেন বলেও আশা করা হচ্ছে। গত মাসে মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসনকে ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের সংশয় রয়েছে।

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা: জোর করে ফেরত পাঠানোর সময় নয়

মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন নিয়ে সবচেয়ে জোরালো উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক মঙ্গলবার বলেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনে জর্জরিত একটি দেশে কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানোর এখন কোনো সময় নয়।

এদিকে, আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত মাসের শেষ দিকে সামরিক বাহিনীর একটি বিমান হামলায় ৫০ জন নিহত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া এবং সম্ভাব্য নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরা।

মালয়েশিয়া থেকে প্রায় দেড় হাজার অভিবাসীর প্রত্যাবাসন তাই কেবল অভিবাসন ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, শরণার্থী সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই কর্মসূচি নতুন মানবিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন