রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

যুদ্ধকালীন বিভাজন ঘিরে প্রচারণা, বসনিয়ায় সাধারণ নির্বাচন

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জাতিগত বিভাজন এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার স্থবিরতার মধ্যেই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উত্তরাধিকার এখনো দেশটির রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গভীর প্রভাব ফেলছে। এবারের নির্বাচনেও সেই যুদ্ধকালীন বিভাজন, জাতিগত পরিচয় এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালাচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

দেশটির জটিল রাজনৈতিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোট দিচ্ছেন নাগরিকেরা। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো তিন সদস্যের প্রেসিডেন্সি পরিষদ। এই পরিষদে বসনিয়াক, সার্ব ও ক্রোয়াট—দেশটির তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর একজন করে প্রতিনিধি দায়িত্ব পালন করেন। ফলে প্রেসিডেন্সি পরিষদের নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয় নয়, বরং দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা এবং জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় একদিকে রয়েছে ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার, অন্যদিকে সার্ব-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি। পাশাপাশি ক্রোয়াট রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ আরও কার্যকর ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে। এসব অবস্থানের মধ্যে পারস্পরিক মতপার্থক্য দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।

যুদ্ধের স্মৃতি ও বিভাজনের রাজনীতি

বসনিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর শিকড় ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে নিহিত। ওই যুদ্ধের অবসান ঘটে ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত ডেটন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। চুক্তিটি দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও একই সঙ্গে জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক ক্ষমতা বণ্টন এবং প্রশাসনিক বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

শান্তিচুক্তির আওতায় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে দুটি প্রধান সত্তায় বিভক্ত করা হয়। এর একটি সার্ব-নিয়ন্ত্রিত রিপাবলিকা সার্পস্কা এবং অন্যটি বসনিয়াক-ক্রোয়াট ফেডারেশন। এই দুটি সত্তাকে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে রাখা হয়েছে। তবে ক্ষমতা বণ্টন, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং জাতিগত প্রতিনিধিত্বের জটিল সমীকরণের কারণে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রায়ই অচলাবস্থা তৈরি হয়।

এই ব্যবস্থার ফলে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্যোগ বারবার বাধার মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের অভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে ভোটারদের হতাশা

দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য এবং জাতিগত বিভাজননির্ভর প্রচারণা চলতে থাকায় ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর পরিবর্তে অতীতের সংঘাত এবং জাতিগত পরিচয়কে নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রে রাখছে।

উত্তর বসনিয়ার তুজলা শহরে ভোটের আগে এএফপির সঙ্গে কথা বলেন বিক্ষোভকারী সংগঠন কার্টন রেভলিউশনের কর্মী আদি সেলমান। তিনি বলেন, বসনিয়ার এই নির্বাচন থেকে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা তাঁর নেই।

৩৪ বছর বয়সী সেলমানের ভাষ্য, ভোটারদের সামনে পছন্দের সুযোগ সীমিত। তাঁর মতে, গত তিন দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় দলগুলো যুদ্ধ, উত্তেজনা, বিভাজন ও অতীতের ঘটনাকে সামনে এনে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।

সেলমানের এই বক্তব্য দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের একাংশের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পরও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় ভোটারদের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব, কার্যকর সংস্কার এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যাশা রয়েছে।

ঐক্য, স্বায়ত্তশাসন ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন

বসনিয়ার নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক বিতর্কের একটি হলো রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব কতটা শক্তিশালী হবে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত হবে। ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলো কার্যকর কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে সার্ব-নিয়ন্ত্রিত রিপাবলিকা সার্পস্কার অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

একই সঙ্গে ক্রোয়াট জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্ক দেশটির নির্বাচনী রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। তিন প্রধান জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা একদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তোলে।

ফলে এবারের নির্বাচন শুধু নতুন প্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের সম্ভাবনাও নতুন করে আলোচনায় আসছে।

শান্তিচুক্তির উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

১৯৯৫ সালের ডেটন শান্তিচুক্তি বসনিয়ায় যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছিল। তবে তিন দশক পরও দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যুদ্ধকালীন বিভাজনের প্রভাব স্পষ্ট। জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে বিরোধ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা বসনিয়ার জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব পেলেও এসব সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সমঝোতা অপরিহার্য।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বসনিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতিগত বিভাজনকে নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহার করার পরিবর্তে কীভাবে অভিন্ন রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, সুশাসন এবং কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয় তার ওপর। ভোটারদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে দেশটি এমন একটি রাজনৈতিক পথে এগিয়ে যাবে, যেখানে অতীতের সংঘাত নয়, বরং স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার গুরুত্ব পাবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন