কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে গতিপথ পরিবর্তনে সক্ষম বলে দাবি করা একটি হাইপারসনিক কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ তদারকি করেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মেয়ে কিম জু আয়ে ও স্ত্রী রি সোল জু। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) এ তথ্য জানিয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোরে উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলীয় শহর ওয়ানসানের কাছের একটি এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি ৭০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট গতিপথ, পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল কিংবা এআই প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
উত্তর কোরিয়ার দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটির বিশেষ সক্ষমতা হলো কম উচ্চতায় উড্ডয়নের সময় নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারা। দেশটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রযুক্তি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রকৃত সক্ষমতা বা একে প্রতিহত করা কতটা কঠিন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
শত্রুকে সামরিক সক্ষমতা উপলব্ধি করাতে চান কিম
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণের পর কিম জং উন বলেন, এই মহড়ার মাধ্যমে কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের পেশাগত দক্ষতা ও পাল্টা হামলার প্রস্তুতি প্রদর্শন করেছেন।
কেসিএনএর প্রতিবেদনে কিমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, নিজেদের কৌশলগত আক্রমণাত্মক সক্ষমতার নির্ভরযোগ্যতা ও প্রাণঘাতী ক্ষমতা সম্পর্কে প্রতিপক্ষকে বারবার উপলব্ধি করাতে উত্তর কোরিয়ার দায়িত্বশীল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
কিমের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শুধু সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ নয়; এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের কাছে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধের বার্তাও পৌঁছে দিতে চায় পিয়ংইয়ং।
কেসিএনএ জানিয়েছে, ‘হাইপারসনিক কৌশলগত অস্ত্র ব্যবস্থা’ পরিচালনাকারী সেনাদের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে এই উৎক্ষেপণ করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রকাশিত ছবিতে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে আগুনের ঝলক ছড়িয়ে আকাশে উঠতে দেখা যায়। অন্য একটি ছবিতে কিমকে হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় দেখা যায়। তাঁর দুই পাশে ছিলেন মেয়ে জু আয়ে ও স্ত্রী রি সোল জু। একটি ছবিতে রি সোল জুকে হাততালি দিতেও দেখা যায়।
এআই প্রযুক্তি নিয়ে উত্তর কোরিয়ার দাবি
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং এর আগে জানিয়েছিলেন, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্রটি কম উচ্চতায় নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। তাঁর দাবি, এই সক্ষমতার কারণে ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করার কোনো উপায় নেই।
তবে এ ধরনের বক্তব্যকে উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, এআই ব্যবস্থার ভূমিকা এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
সাধারণভাবে, উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধি আগাম অনুমান করা কঠিন হতে পারে। এতে প্রতিপক্ষের রাডার, শনাক্তকরণব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু এআই ব্যবহারের দাবি থেকেই কোনো অস্ত্রকে অপ্রতিরোধ্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় কিমের মেয়ে
ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সময় কিমের মেয়ে জু আয়ের উপস্থিতিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো তাঁকে জনসমক্ষে আনা হয়। এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি বাড়তে দেখা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, জু আয়ে কিম জং উনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হতে পারেন। তবে উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নিয়ে দেশটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁর উপস্থিতিকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে দেখা হলেও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
কিমের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রি সোল জুর উপস্থিতিও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত ছবিতে স্পষ্ট হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার মতো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় ও সামরিক অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি দেশটির নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক বার্তা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী উত্তর কোরিয়ার কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানোর কয়েক দিন পর এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটল। সিউলের অভিযোগ, অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) একটি বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হয়েছেন এবং এর জন্য উত্তর কোরিয়া দায়ী। তবে পিয়ংইয়ং গত মাসে ঘটে যাওয়া ওই বিস্ফোরণের দায় অস্বীকার করেছে।
এর আগে গত শুক্রবার উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘জঘন্য’ বলে আখ্যা দেয়। এমন বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বেসামরিক নেতৃত্ব দুই দেশের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সামরিক তৎপরতা এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে সেই উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ
উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং উন্নত অস্ত্রপ্রযুক্তি নিয়ে দেশটির ঘোষণাগুলো কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অস্ত্রের উন্নয়ন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সামরিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে উত্তর কোরিয়ার ঘোষিত সক্ষমতা এবং বাস্তবে পরীক্ষিত প্রযুক্তিগত সাফল্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যকারিতা, নির্ভুলতা এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে চলার সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত মূল্যায়নের জন্য আরও স্বাধীন প্রযুক্তিগত তথ্য প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, কিম জং উনের তদারকিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একই সঙ্গে এআই-নির্ভর অস্ত্রপ্রযুক্তি নিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের দাবি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিযোগিতার আলোচনাকে আরও জোরালো করতে পারে।

