রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

গাজায় জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী আটকে যাচ্ছে

‘ভয়াবহ পরিণতির’ সতর্কতা WHO’র

কৃত্রিম অঙ্গের একটি চালান ছয় মাসে চারবার প্রত্যাখ্যান • ত্রাণ প্রবেশে কার্যত নির্ভরতা কেরেম শালোমের ওপর • গাজার ৩৬ হাসপাতালের মাত্র ১৯টি আংশিক সচল • শীতের আগে আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসংকটে বাড়ছে রোগ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রান্তকাল

গাজায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, কৃত্রিম অঙ্গ এবং জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বারবার বিলম্ব ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। সংস্থাটি বলছে, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সঠিক সময়ে না পৌঁছালে অনুমোদন পাওয়া বা ট্রাক সীমান্ত পার হওয়ার পরিসংখ্যান দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়।

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইতোমধ্যেই চরম চাপে রয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর WHO মহাপরিচালক জানান, গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টি আংশিকভাবে কার্যকর এবং একটিও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। জরুরি ওষুধ, রোগনির্ণয় সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানিরও তীব্র ঘাটতি রয়েছে।

‘সঠিক জিনিস দেরিতে পৌঁছালেও জীবন বাঁচে না’

ফিলিস্তিনে WHO-এর প্রতিনিধি রেইনহিল্ডে ভ্যান ডি উইয়ার্ডট বলেছেন, অগ্রাধিকারহীন সামগ্রীবোঝাই ট্রাক পৌঁছানো কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী যখন প্রয়োজন তখন না পৌঁছানো—কোনোটিই জীবন বাঁচায় না।

তিনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রতি চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনায় বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত অত্যাবশ্যক চিকিৎসাসামগ্রীকে ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য’ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনুমোদিত ত্রাণ গাজায় প্রবেশের প্রধান পথ কেরেম শালোম। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যায়, গাজায় প্রয়োজনীয় পণ্য প্রবেশে একটি মাত্র ক্রসিংয়ের ওপর নির্ভরতা ত্রাণ কার্যক্রমকে সীমিত করে রেখেছে।

ছয় মাসে চারবার ফেরত কৃত্রিম অঙ্গের চালান

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অঙ্গহানি হওয়া মানুষের পুনর্বাসনসামগ্রী নিয়ে।

ভ্যান ডি উইয়ার্ডট জানিয়েছেন, কৃত্রিম অঙ্গ ও সহায়ক চিকিৎসা সরঞ্জামের একটি চালান গত ছয় মাসে চারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

প্রতিটি প্রত্যাখ্যানের অর্থ—যুদ্ধ বা হামলায় অঙ্গ হারানো কোনো একজন মানুষকে আবার হাঁটার সুযোগ পাওয়ার জন্য আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

WHO সেপ্টেম্বরের শুরুতেই জানিয়েছিল, গাজায় ৬ হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এবং কৃত্রিম অঙ্গ বা সংশ্লিষ্ট সেবার প্রয়োজন। অথচ দুই বছরের বেশি সময় ধরে WHO গাজায় কৃত্রিম অঙ্গ ও প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন সরঞ্জাম পাঠাতে পারেনি।

‘একটি পথ নয়, একাধিক ক্রসিং খুলতে হবে’

WHO বলছে, তাদের দাবি স্পষ্ট—গাজায় মানবিক ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশ হতে হবে বাধাহীন, পূর্বানুমানযোগ্য এবং প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাণে।

একই সঙ্গে একটি সীমান্তপথের ওপর নির্ভর না করে একাধিক ক্রসিং ব্যবহার করার সুযোগ চেয়েছে সংস্থাটি। এতে গাজার বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত জরুরি সামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হবে।

WHO-এর হিসাবে, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ক্যানসার রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না, কিডনি রোগীদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ওষুধ-সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞের অভাবে মা ও নবজাতকদের ঝুঁকিও বেড়েছে।

সামনে শীত, নতুন বিপদ রোগের

শীত এগিয়ে আসায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছে WHO। নিরাপদ আশ্রয় ও বিশুদ্ধ পানির অভাবের সঙ্গে রয়েছে বর্জ্য, নর্দমা ও ইঁদুরসহ রোগবাহিত ঝুঁকি।

WHO মহাপরিচালক সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিলেন, উপচে পড়া পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জমে থাকা বর্জ্য এবং নিরাপদ পানির সীমিত প্রাপ্যতা গাজায় ক্রমেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। বৃষ্টিতে বন্যা হলে নর্দমা ও দূষিত পানি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।

জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা

এর মধ্যেও গাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবন ঝুঁকিতে রেখে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু WHO-এর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁদের নেই।

WHO বলছে, গাজার মানুষের প্রয়োজন এখন শুধু ত্রাণবাহী ট্রাকের সংখ্যা বাড়ানো নয়; সঠিক চিকিৎসাসামগ্রী সঠিক সময়ে রোগীর কাছে পৌঁছানোই আসল বিষয়।

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা যখন পূর্ণ সক্ষমতার একটি হাসপাতালও পাচ্ছে না এবং হাজারো অঙ্গহানি হওয়া মানুষ পুনর্বাসনের অপেক্ষায়, তখন চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে প্রতিটি বিলম্ব সরাসরি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলছে।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন