মালিকানা হস্তান্তরের পরও দাতার থাকবে জীবনকালীন ভোগাধিকার • নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে প্রযোজ্য • হেবা ও প্রচলিত দান পদ্ধতি বহাল • বিশেষ প্রয়োজনে পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের সুযোগ
সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাড়ি, জমি বা অন্য সম্পত্তি দান করে দেওয়ার পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সম্পত্তি নিজে ব্যবহার ও ভোগ করার আইনি অধিকার রাখতে পারবেন বাবা-মা। একই সুযোগ নির্দিষ্ট শর্তে দাদা-দাদি, নানা-নানি, সন্তান-সন্ততি এবং স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে Transfer of Property (Amendment) Act, 2026-এর মাধ্যমে। সংশোধিত আইনে ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ বা Gift with reservation of the right of lifetime enjoyment নামে স্বতন্ত্র একটি হস্তান্তর পদ্ধতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে একজন ব্যক্তি নির্ধারিত পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তির মালিকানা দান করতে পারবেন, কিন্তু জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতি নিয়ে আইনটি ৮ সেপ্টেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এটি ২০২৬ সালের ১০৫ নম্বর আইন এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়েছে।
কারা এই পদ্ধতিতে সম্পত্তি দান করতে পারবেন
সংশোধিত আইনের ১২২A ধারায় এই বিশেষ ধরনের দানের সুযোগ সবার মধ্যে রাখা হয়নি। নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।
আইন অনুযায়ী, পিতা-মাতা সন্তান বা সন্তানদের, দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিদের সম্পত্তি দিতে পারবেন। একইভাবে সন্তান পিতা-মাতা বা দাদা-দাদিকে এবং নাতি-নাতনি দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে দিতে পারবেন। স্বামী ও স্ত্রীও পরস্পরের মধ্যে এভাবে সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের দান কার্যকর করতে নিবন্ধিত দলিল সম্পাদন করতে হবে। অর্থাৎ শুধু মৌখিক ঘোষণা বা অনিবন্ধিত কাগজে জমি-বাড়ির ক্ষেত্রে এই বিশেষ আইনি সুরক্ষা পাওয়া যাবে না।
মালিকানা সন্তানের, ভোগাধিকার বাবা-মায়ের
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মালিকানা এবং জীবনকালীন ভোগাধিকারের মধ্যে আইনি পার্থক্য তৈরি করা।
উদাহরণ হিসেবে একজন বাবা তার একটি বাড়ি ছেলেকে এই আইনের আওতায় দান করতে পারেন। দানের মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকার ছেলের অনুকূলে গেলেও দলিলে বাবা নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
ফলে বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত বাড়িটি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার তার থাকবে।
এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো, জীবদ্দশায় উত্তরসূরিদের সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দাতা যেন নিজের আবাসন ও আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন।
সন্তান আগে মারা গেলেও দাতার অধিকার থাকবে
আইনে এমন পরিস্থিতির কথাও রাখা হয়েছে, যেখানে সম্পত্তির দানগ্রহীতা দাতার আগেই মারা যান।
১২২A(৩) অনুযায়ী, দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় দানগ্রহীতা মারা গেলে প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন অনুসারে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে।
কিন্তু তাতেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার শেষ হবে না।
অর্থাৎ সম্পত্তির পরবর্তী মালিক যিনিই হন না কেন, মূল দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তার সংরক্ষিত ভোগাধিকার সম্পত্তির সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
হেবা বাতিল হচ্ছে না
নতুন আইন নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—এর ফলে মুসলিম আইনের ‘হেবা’ বা প্রচলিত অন্য দান ব্যবস্থা পরিবর্তিত হচ্ছে কি না।
সংশোধিত আইনের ১২২A(৪) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দান করাকে একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হবে। এর কারণে বিদ্যমান gift, Heba বা অন্য কোনো আইনস্বীকৃত হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতা সীমিত বা ক্ষুণ্ন হবে না।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও বাসসকে বলেছেন, নতুন ব্যবস্থা হেবা, গিফট বা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে সম্পত্তি হস্তান্তরে বাধা সৃষ্টি করবে না। কেউ চাইলে প্রচলিত হেবা করতে পারবেন, আবার নতুন ব্যবস্থাও বেছে নিতে পারবেন।
ইসলামী আইনের সঙ্গে নতুন বিধানের বৈপরীত্য রয়েছে—এমন অভিযোগও নাকচ করেছেন আইনমন্ত্রী। তার বক্তব্য, হেবার বিধানে পরিবর্তন না এনে আলাদা একটি বিকল্প ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।
একবার নিবন্ধন হলে ইচ্ছামতো বাতিল করা যাবে না
নতুন আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা রয়েছে ১২২B ধারায়।
জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে করা দান একবার নিবন্ধিত হয়ে গেলে সাধারণভাবে সেটি অপ্রত্যাহারযোগ্য হবে।
অর্থাৎ সম্পত্তি দান করার পর দাতা একক সিদ্ধান্তে যখন-তখন দান বাতিল করতে পারবেন না। একইভাবে গ্রহীতাও একতরফাভাবে দাতার সংরক্ষিত জীবনকালীন অধিকার তুলে দিতে পারবেন না।
তবে আইন কিছু ব্যতিক্রম রেখেছে।
চিকিৎসা বা আর্থিক প্রয়োজনে পরিবর্তনের সুযোগ
দান করার পর পরিস্থিতি বদলে গেলে কী হবে—আইনে তারও ব্যবস্থা রয়েছে।
আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক অথবা অন্য কোনো প্রকৃত ও যৌক্তিক প্রয়োজন দেখা দিলে দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অধিকার পরিবর্তন, প্রত্যাহার বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করা যাবে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে যদি দাতা বৃদ্ধ বয়সে চিকিৎসা বা অন্য জরুরি প্রয়োজনে সম্পত্তি বিক্রি বা অন্যভাবে ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করেন।
তবে এর জন্য আইনে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
সম্মতি পাওয়া না গেলে জেলা জজের কাছে যেতে হবে
কোনো কারণে দাতা বা গ্রহীতার সম্মতি নেওয়া সম্ভব না হলেও আইনি পথ বন্ধ থাকবে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে কিংবা অন্য কোনো যথেষ্ট কারণে তার সম্মতি নেওয়া সম্ভব না হলে অপর পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
জেলা জজ প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট অধিকার পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের অনুমতি দিতে পারবেন।
তবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে আদালতকে সম্পত্তিতে স্বার্থ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নোটিশ দিতে হবে, প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করতে হবে এবং আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হতে হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ নতুন ব্যবস্থা
বাংলাদেশে অনেক পরিবারেই বাবা-মা জীবদ্দশায় সন্তানদের নামে জমি বা বাড়ি লিখে দেন। পরবর্তী সময়ে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রবীণ বাবা-মায়ের আবাসন, আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
নতুন ব্যবস্থায় সম্পত্তির ভবিষ্যৎ মালিকানা নির্ধারণ এবং দাতার জীবদ্দশার নিরাপত্তা—দুটি বিষয়কে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া নতুন ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী বলে বাসসকে জানিয়েছেন, সন্তানদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর পিতা-মাতার অসহায় হয়ে পড়ার ঘটনা সমাজে রয়েছে। তার মতে, সংশোধিত বিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ হলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনি সুরক্ষা দিতে পারে।
আইনজীবী ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়ার মতে, এর মাধ্যমে দাতা নিজের জীবনকালীন নিরাপত্তা বজায় রেখেই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণ করতে পারবেন। তিনি এটিকে প্রবীণ বয়সে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি আইনি ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন।
নতুন আইনে যা জানা জরুরি
প্রথমত, এটি প্রচলিত হেবা বা অন্যান্য বৈধ দান পদ্ধতির বিকল্প; সেগুলো বাতিল করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, এই বিশেষ সুবিধা কেবল আইনে নির্ধারিত নিকটাত্মীয়দের মধ্যে প্রযোজ্য।
তৃতীয়ত, স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল আবশ্যক।
চতুর্থত, দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত নিজের জন্য সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
পঞ্চমত, দানগ্রহীতা আগে মারা গেলেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে।
ষষ্ঠত, নিবন্ধনের পর এ ধরনের দান সাধারণভাবে অপ্রত্যাহারযোগ্য।
সপ্তমত, প্রকৃত আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা বা পারিবারিক প্রয়োজন দেখা দিলে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে; সম্মতি পাওয়া সম্ভব না হলে নির্ধারিত পরিস্থিতিতে জেলা জজের অনুমতি নেওয়া যাবে।
ফলে সম্পত্তি জীবদ্দশায় উত্তরসূরিদের কাছে হস্তান্তর করতে চান, আবার নিজের বসবাস, ব্যবহার ও ভোগের অধিকারও নিশ্চিত রাখতে চান—এমন মানুষের জন্য বাংলাদেশের সম্পত্তি আইনে এখন একটি পৃথক আইনি পথ তৈরি হলো।

