কো-পাইলটের হামলার পর দ্রুত নামছিল উড়োজাহাজ • দরজা খুলতেই ছুটে যান যাত্রী-ক্রুরা • নিয়ন্ত্রণ নেন বিকল্প পাইলটরা • সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রান্তকাল
গুরুতর আহত হয়ে ককপিটের মেঝেতে পড়ে ছিলেন ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। এর মধ্যেই অভিজ্ঞ এই ভারতীয় পাইলট বুঝতে পারেন, ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি দ্রুত উচ্চতা হারাচ্ছে। তার ভাষায়, সামনে ককপিটের দরজাটি দেখে বুঝেছিলেন এটাই হয়তো শেষ সুযোগ।
শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সেই দরজা খুলে দেন তিনি। এরপর ককপিটে ঢুকে পড়েন যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা। অভিযুক্ত কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং উড়োজাহাজে থাকা অন্য পাইলটরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করেন।
দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট FZ1073-এ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ঘটনার পর হাসপাতালের শয্যা থেকে প্রথমবার বিস্তারিতভাবে সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার।
শুক্রবার আবুধাবির একটি হাসপাতাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন তিনি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় ১০ মিনিটের ওই কথোপকথনের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
‘বুঝতে পারছিলাম বিমান নিচে নেমে যাচ্ছে’
১৭ বছরের উড্ডয়ন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্মিত মাচ্ছার জানান, গুরুতর আহত হওয়ার পরও তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে সাহায্য করেছিল। তিনি ১১ বছর ধরে ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মোদিকে তিনি জানান, আঘাতের কারণে একপর্যায়ে ককপিটের মেঝেতে পড়ে যান। সেখান থেকেই বুঝতে পারছিলেন উড়োজাহাজটি দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
তার সামনে তখন ককপিটের দরজা।
মাচ্ছারের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি বুঝেছিলেন সেটি খুলতে না পারলে যাত্রীদের জীবনও বিপন্ন হতে পারে। হামলা চলতে থাকার মধ্যেই শেষ চেষ্টা হিসেবে দরজাটি খুলে দেন। এরপর বাইরে থাকা যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে প্রবেশ করতে সক্ষম হন।
প্রায় ১৭ হাজার ফুট নেমে যায় বিমান
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় Boeing 737 MAX 8 উড়োজাহাজটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল।
Flightradar24-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ০৫:২১:০৯ GMT-তে উড়োজাহাজটির তীব্র অবতরণ শুরু হয়। প্রায় ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে এটি ৩৪ হাজার ফুট থেকে প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ ফুটে নেমে আসে—অর্থাৎ প্রথম ধাক্কায় প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতা হারায়।
এরপর বিমানটি আবার প্রায় ২১ হাজার ৭২৫ ফুট পর্যন্ত ওপরে ওঠে এবং আবার ১৫ হাজার ফুটে নেমে আসে। প্রায় ২০০ সেকেন্ড ধরে তীব্র উত্থান-পতনের পর বিমানটি স্থিতিশীল হয়।
Reuters-এর প্রতিবেদনে আরও কম সময়ের একটি তীব্র পতনের পর্যায়ে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতা হারানোর কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে পতনের সময়সীমা ও পরিমাপের বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে।
জরুরি সংকেত থেকে ‘অবৈধ হস্তক্ষেপের’ কোড
ঘটনার সময় উড়োজাহাজ থেকে পাঠানো ট্রান্সপন্ডার সংকেতও পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দেয়।
ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ‘7700’ সাধারণ জরুরি অবস্থার সংকেত দেওয়া হয়। পরে সেটি ‘7500’-তে পরিবর্তন করা হয়, যা উড়োজাহাজে বেআইনি হস্তক্ষেপ বা সম্ভাব্য হাইজ্যাকিং পরিস্থিতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
প্রায় এক ঘণ্টা ওই কোড সক্রিয় থাকার পর আবার সাধারণ জরুরি সংকেত ‘7700’ দেওয়া হয়।
যাত্রী ও ক্রুরা কো-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে নেন
মাচ্ছারের ভাষ্য অনুযায়ী, ককপিটের দরজা খোলার পর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ভেতরে ঢুকে অভিযুক্ত কো-পাইলটকে পরাস্ত করেন।
এরপর উড়োজাহাজে থাকা অন্য পাইলটরা নিয়ন্ত্রণ নেন। বিমানটি গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরের দিকে যায় এবং স্থানীয় সময় অনুযায়ী সেখানে জরুরি অবতরণ করে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও AP-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন রিজার্ভ পাইলট উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। মাচ্ছারের বর্ণনায় অন্য দুই ফ্লাইদুবাই পাইলটের সহায়তার কথা এসেছে।
কতজন ছিলেন বিমানে
আরোহীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে সামান্য পার্থক্য রয়েছে।
Reuters ও AFP-ভিত্তিক প্রতিবেদনে ফ্লাইটটিতে ১৭৪ জন যাত্রী থাকার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে AP-ভিত্তিক প্রতিবেদনে ক্রুসহ মোট ১৮২ জন আরোহী থাকার তথ্য এসেছে। দুটি হিসাব পরস্পরবিরোধী নাও হতে পারে একটি শুধু যাত্রী এবং অন্যটি যাত্রী ও ক্রু মিলিয়ে মোট আরোহীর সংখ্যা নির্দেশ করছে।
সৌদি প্রাথমিক তদন্তে কী জানা গেছে
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছে, ফ্লাইটের কো-পাইলট ক্যাপ্টেনকে আক্রমণ করেছিলেন। তবে হামলার উদ্দেশ্য ও এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট পাইলটদের UAE কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথাও জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সংযুক্ত আরব আমিরাত আলাদাভাবে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
‘সন্ত্রাসী উদ্দেশ্য’ ছিল কি না, তদন্ত করছে UAE
UAE কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনাটির সঙ্গে কোনো ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা উদ্দেশ্য’ যুক্ত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।
UAE প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্যাপ্টেন মাচ্ছারের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
তবে হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, অভিযুক্ত কো-পাইলট ‘ইসলামপন্থী উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত’ হয়েছিলেন এবং তার আচরণ আত্মঘাতী ধরনের ছিল। তবে AP-ভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই দাবির পক্ষে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে বিস্তারিত প্রমাণ দেননি। অভিযুক্তের উদ্দেশ্য এখনো তদন্তাধীন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত ইরান এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল—এমন কোনো চূড়ান্ত তদন্ত-ফল প্রকাশ করা হয়নি।
‘নিজের জীবন বাঁচাচ্ছিলাম, কিন্তু সবাইকে মরতে দিতে পারতাম না’
হাসপাতাল থেকে মোদির সঙ্গে আলাপে মাচ্ছার বলেন, ওই মুহূর্তে নিজের জীবন রক্ষার চেষ্টা করলেও উড়োজাহাজে থাকা অন্য মানুষগুলোর জীবন নিয়েও তিনি ভাবছিলেন।
সংকটের মধ্যে হিন্দু ধর্মীয় প্রার্থনা পাঠ করার কথাও জানান তিনি। তার বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তাই তাকে বাঁচিয়েছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাচ্ছারের উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, তার পদক্ষেপ বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছে এবং বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে আবুধাবির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাচ্ছার। প্রকাশিত ভিডিওতে তার মাথায় ব্যান্ডেজ এবং নাকে অক্সিজেন টিউব দেখা যায়। তিনি জানিয়েছেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে, তবে আবারও সুস্থ হয়ে ওঠার বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
এদিকে ঘটনাটি আধুনিক উড়োজাহাজের ককপিট নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ৯/১১-এর পর অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ ঠেকাতে ককপিটের দরজা ব্যাপকভাবে সুরক্ষিত করা হলেও হুমকি যদি ককপিটের ভেতর থেকেই আসে, তখন সেই একই ব্যবস্থা কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—FZ1073-এর ঘটনা সেই বিতর্কও সামনে এনেছে।

