রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

সম্ভাব্য স্থল হামলা মোকাবিলায় নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য স্থল হামলা মোকাবিলায় সাধারণ নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। এ লক্ষ্যে রাজধানী তেহরানে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নতুন এই কর্মসূচির আওতায় বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের প্রাথমিক সামরিক জ্ঞান ও প্রতিরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইরানের দাবি, শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য নতুন হামলা মোকাবিলা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার তেহরানের হাফত-ই তির স্কয়ারে নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয়। আগামী কয়েক সপ্তাহে সেখানে বেসামরিক নাগরিকদের বিভিন্ন ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে সেনাসদস্যদের ছদ্মবেশের রঙ করা বিমানবিধ্বংসী সরঞ্জাম নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যায়। এ ছাড়া বাধা অতিক্রমের অনুশীলন এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হেডসেট ব্যবহার করে অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণের দৃশ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুত এক হাজার ব্যাটালিয়ন

ইরানের আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান আলী কোসারি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এই কর্মসূচির জন্য এক হাজার ব্যাটালিয়ন প্রস্তুত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় প্রতিরক্ষা জোরদারে শুধু নিয়মিত বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বেসামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে তেহরান।

কোসারি বলেন, শত্রুপক্ষ আবারও কোনো ‘ভুল হিসাব’ করে হামলা চালালে ইরানের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবিলা করবে। তাঁর বক্তব্যে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সমন্বয় এবং প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুত এক হাজার ব্যাটালিয়নের সাংগঠনিক কাঠামো, প্রতিটি ব্যাটালিয়নে সম্ভাব্য সদস্যসংখ্যা কিংবা তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘জানফাদা’ কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছে সেনাবাহিনীর চার শাখা

ইরানের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা বিষয়ক উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা আলিয়ান-নেজাদ জানিয়েছেন, ‘জানফাদা’ নামের এই কর্মসূচি তেহরানের নির্ধারিত তিনটি কেন্দ্রে শুরু হবে। এ উদ্যোগের আওতায় বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের প্রাথমিক সামরিক দিকনির্দেশনা দিতে ইরানের সেনাবাহিনীর চারটি শাখার সদস্যদের নির্ধারিত ফিল্ড-ব্যারাক কেন্দ্রগুলোতে মোতায়েন করা হবে।

আলিয়ান-নেজাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পরে তাঁদের জন্য তুলনামূলক উন্নত পর্যায়ের কোর্সের ব্যবস্থা থাকবে। দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার প্রয়োজন দেখা দিলে যেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাগরিকদের কাজে লাগানো যায়, সেই লক্ষ্যেই তাঁদের সামরিক বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান ও দক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে প্রশিক্ষণের মেয়াদ, অংশগ্রহণকারীদের যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড, প্রশিক্ষণের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু এবং পরবর্তী সময়ে তেহরানের বাইরে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সংঘাতের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের পর ইরান সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে ৪০ দিনের যুদ্ধ থামলেও পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে শত্রুতা অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য নতুন হামলা, বিশেষ করে স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে বেসামরিক নাগরিকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান।

সামরিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার একদিকে জনগণকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করতে পারে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে দেশের প্রতিরক্ষায় ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার বার্তাও দিতে পারে। তবে নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও ‘জানফাদা’ কর্মসূচি বাস্তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতায় কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের পরিধি, অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা এবং নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের সমন্বয়ের ওপর।

স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহে ব্যাপক সাড়া দেওয়ার দাবি

এর আগে সামরিক শক্তি বাড়ানোর অংশ হিসেবে সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবক আহ্বান করেছিল ইরান। দেশটির সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই আহ্বানে প্রাথমিকভাবে ১ কোটি ৪০ লাখ থেকে ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ সাড়া দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৬ লাখ স্বেচ্ছাসেবক ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও বাসিজ বাহিনীর সঙ্গে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারেন বলে জানা গেছে।

তবে এই সংখ্যাগুলো ইরান সরকারের দেওয়া হিসাব; স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে এগুলোকে বিবেচনা করার সুযোগ সীমিত। আহ্বানে সাড়া দেওয়া ব্যক্তিদের কতজন বাস্তবে প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন, কতজন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন এবং তাঁদের কী ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে—এসব বিষয়ও স্পষ্ট নয়।

বেসামরিক প্রতিরক্ষা নিয়ে নতুন গুরুত্ব

ইরানের নতুন উদ্যোগে বেসামরিক নাগরিকদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। সম্ভাব্য হামলার সময় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, নির্দেশনা অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনের মতো বিষয় এ ধরনের কর্মসূচির অংশ হতে পারে। তবে ইরানের ঘোষিত প্রশিক্ষণে ঠিক কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশিত হয়নি।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের নতুন সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু করা দেশটির প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ। তেহরান এই উদ্যোগকে সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে তুলে ধরছে। তবে কর্মসূচির প্রকৃত ব্যাপ্তি, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাগরিকদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষায় এর প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে আরও তথ্যের প্রয়োজন হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন