নেপাল-তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার ৩৭ দিন পর এক মালয়েশীয় নাগরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে। চীনা বংশোদ্ভূত ওই ব্যক্তি নিরাপদে দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে নিখোঁজদের পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন মালয়েশিয়া সলিডারিটি: ফ্যামিলিজ ইন হোপ (মাসফিহ)। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর তাঁর সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে একই দুর্যোগে নিখোঁজ অন্যদের ভাগ্য নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই মালয়েশীয় নাগরিক একা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নেপালে গিয়েছিলেন। ভয়াবহ বন্যার পর যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় তিনি সাময়িকভাবে একটি দুর্গত এলাকায় আটকা পড়েন। পরে নিজ উদ্যোগে কাঠমান্ডুতে মালয়েশিয়ার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিরাপদে দেশে ফেরেন।
মাসফিহের মুখপাত্র মানিভান্নান রেথিনাম এক বিবৃতিতে বলেন, ৩৭ দিন পর একজন মালয়েশীয় নাগরিককে নিরাপদে খুঁজে পাওয়া সংগঠনটির পাশাপাশি নিখোঁজদের পরিবারের জন্যও অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা পরিবারগুলোর জন্য এ ঘটনা নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট বিকেল ৩টা ২৬ মিনিটে ওই ব্যক্তির অবস্থান নাথথালি ভিউপয়েন্ট এলাকায় শনাক্ত করা হয়েছিল। ভয়াবহ বন্যার এক দিন আগে তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন। তাঁর স্বজনদের দেওয়া তথ্যের বরাতে রেথিনাম জানান, ওই এলাকায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তিনি সাময়িকভাবে আটকা পড়েন। পরবর্তী সময়ে যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৫৫ মালয়েশীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
গত ২৭ আগস্ট মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বন্যার পর কাঠমান্ডুতে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা ৫৫ জন মালয়েশীয় নাগরিকের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে একজনের সন্ধান পাওয়ায় স্বস্তি তৈরি হলেও বাকিদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
নেপাল-তিব্বত অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর বিভিন্ন দেশের বহু পর্যটক ও নাগরিক নিখোঁজ হন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সড়ক ও সেতু ধ্বংস এবং যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে উদ্ধার ও অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ায় নিখোঁজদের শনাক্ত ও উদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
হিমবাহ ধস থেকে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিমালয়ের লাংটাং লিরুং এলাকার কাছে হিমবাহ ধস ও তুষারধসের পর ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সূত্রপাত হয়। এতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। প্রাণহানির পাশাপাশি বহু মানুষ নিখোঁজ হন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) বিশ্লেষণের বরাতে বলা হয়েছে, হিমবাহ ধসের ঘটনায় প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমপরিমাণ শক্তি সৃষ্টি হয়েছিল। এই বিপুল শক্তির প্রভাবে বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
দুর্যোগের ব্যাপকতা এতটাই বেশি ছিল যে নেপালের পাশাপাশি প্রতিবেশী তিব্বত ও চীনেও বহু মানুষ নিখোঁজ হন। দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
৩০টিরও বেশি দেশের নাগরিক নিখোঁজ
নেপালের পর্যটন বিভাগের ১৭ সেপ্টেম্বরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ ৩০টিরও বেশি দেশের নাগরিক তখনো নিখোঁজ ছিলেন। ওই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিখোঁজদের মধ্যে ১৮০ জনের বেশি ভারতীয়, ৬৫ জন মার্কিন, ৫৪ জন মালয়েশীয়, ৫৪ জন ইউক্রেনীয়, ৩৭ জন চীনা, ৩৩ জন অস্ট্রেলীয়, ৩৩ জন লাটভীয়, ৩২ জন ব্রিটিশ এবং ৩০ জন কানাডীয় নাগরিক রয়েছেন।
এ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৪০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে নিখোঁজ ও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করতে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বড় পরিসরে ডিএনএ শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্যোগের প্রাথমিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নেপালের প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থা পুনঃস্থাপন এবং দুর্গত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়াই এখন দেশটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
নিখোঁজদের বিষয়ে নেপাল সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ
এদিকে মাসফিহের মুখপাত্র মানিভান্নান রেথিনাম জানিয়েছেন, সংগঠনটি নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছে। নিখোঁজদের অনুসন্ধান কার্যক্রমের অগ্রগতি, পরিবারগুলোর জন্য পরবর্তী করণীয় এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেসব বিষয়ে আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চান তাঁরা।
রেথিনামের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সাক্ষাতের উদ্যোগ শুধু উদ্বেগ প্রকাশের জন্য নয়; বরং নিখোঁজদের স্বজনদের কাছে অনুসন্ধান কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়াও এর উদ্দেশ্য।
৩৭ দিন পর একজন মালয়েশীয় নাগরিকের নিরাপদে ফিরে আসা নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। তবে একই দুর্যোগে নিখোঁজ থাকা অন্যদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের পরিবারগুলোর অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকবে। নিখোঁজদের দ্রুত শনাক্ত করা, উদ্ধার কার্যক্রমে গতি আনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

