রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ছবি হোয়াইট হাউস থেকেই দেওয়া: মাহদী আমিন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার না চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, ছবিটি হোয়াইট হাউস থেকেই প্রকাশ করা হয়েছে এবং ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও সেটি নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছে। তাই ছবিটি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো কিংবা রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরির আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

রোববার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন মাহদী আমিন। প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই নেতা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক, শেয়ার, কমেন্ট ও ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে অনেক সময় মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচারের বিস্তার ঘটছে। সত্য তথ্যকে ভিত্তি করে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো রাজনীতির সুস্থ সংস্কৃতি হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি প্রকাশের পর সেটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ছবিটি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত হয়েছে। রোববার ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসও ছবিটি শেয়ার করেছে। তাঁর প্রশ্ন, নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে ছবি প্রকাশের পরও কেন এ নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হবে?

ছবি নিয়ে বিতর্কের জবাব উপদেষ্টার

প্রধানমন্ত্রী ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ এবং ছবির বিষয়টি সরকার স্পষ্ট করছে না কেন—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমিন বলেন, সত্য ও ন্যায্য বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের অবকাশ নেই। মার্কিন দূতাবাস নিজেই ছবিটি শেয়ার করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর চেয়ে বড় ব্যাখ্যা আর কী হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ হওয়া স্বাভাবিক কূটনৈতিক বিষয়। তাঁর দাবি, দুই নেতার মধ্যে আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা হয়েছে। এ নিয়ে সরকারপ্রধান কেন মিথ্যাচার করবেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তবে সাক্ষাতের সময়, স্থান, আলোচনার বিষয়বস্তু এবং বৈঠকের আনুষ্ঠানিক বিবরণ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। ফলে ছবির উৎস সম্পর্কে উপদেষ্টার বক্তব্যের পাশাপাশি সাক্ষাতের অন্যান্য তথ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রের আনুষ্ঠানিক বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ।

জুবাইদা রহমানকে নিয়েও ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ

প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে ঘিরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, একটি অনুষ্ঠানে জুবাইদা রহমান একজন বিতর্কিত ব্যক্তির সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন—এমন তথ্য প্রচার করা হয়েছিল। পরে আয়োজকেরা বিষয়টি ভুল বলে নিশ্চিত করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

মাহদী আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রচারের ফলে কোনো ঘটনা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানার আগেই মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য যাচাই করে বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন।

জাইমা রহমানের চাকরি নিয়ে অপপ্রচারের দাবি

প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়েও অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন মাহদী আমিন। তাঁর ভাষ্য, জাইমা রহমান জাতিসংঘে নিজের যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন। এর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ তাঁর চাকরি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে বলে প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মাহদী আমিনের মতে, কোনো ব্যক্তির পেশাগত অর্জনকে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করে ভুল তথ্য ছড়ানো অনুচিত। তবে জাতিসংঘে জাইমা রহমানের চাকরির ধরন, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং এ বিষয়ে প্রচারিত দাবিগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়নি।

বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়েও বক্তব্য

ক্ষমতাসীন বিএনপিকে ঘিরেও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মাহদী আমিন। সম্প্রতি এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের তোলা চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, পরবর্তী সময়ে বিষয়টি ভিন্ন বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি অবৈধ হওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল এবং এর সঙ্গে রাজনীতির সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে ওই ঘটনায় ভাঙচুরের বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত বলে স্বীকার করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং গ্রেপ্তার, মামলা ও তদন্ত চলছে বলেও জানান।

মাহদী আমিনের অভিযোগ, ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট সামনে আসার পরও বিএনপির নাম জড়িয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রচার করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্তের চূড়ান্ত ফল কিংবা অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সত্য ও ন্যায্য তথ্য তুলে ধরার আহ্বান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় কোনো ঘটনার প্রকৃত তথ্যের চেয়ে তার প্রচার ও ভিউ বাড়ানোর প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পায় বলে মন্তব্য করেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, সমাজে গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। যা সত্য ও ন্যায্য, তা তুলে ধরতে হবে; একইভাবে অনৈতিক বা অন্যায্য কোনো ঘটনা ঘটলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে প্রকাশ করা উচিত।

বর্তমান সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ বাকস্বাধীনতা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষ্য, অতীতে দুর্নীতি, দুঃশাসন ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে কথা বলতে মানুষ ভয় পেত। বিএনপিসহ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত অনেকে সে সময় প্রতিবাদ করতে রাজপথে নেমেছিলেন।

তবে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী, কন্যা এবং ক্ষমতাসীন দলকে ঘিরেও প্রতিনিয়ত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মাহদী আমিনের মতে, গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণ এবং তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা জরুরি।

স্কুলশিক্ষককে থানায় নেওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

কুষ্টিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর নামে কটূক্তির অভিযোগে এক স্কুলশিক্ষককে থানায় নেওয়ার ঘটনাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন মাহদী আমিন। তিনি জানান, বিষয়টি জানার পর প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন। পরে ওই শিক্ষককে পুলিশি পাহারায় সম্মানের সঙ্গে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

এ ঘটনাকে বাকস্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, মতপ্রকাশের কারণে কাউকে অপমান করা কিংবা অশোভন আচরণ করা উচিত নয়। তাঁর মতে, ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সবার সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌজন্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানে যাঁরা শহীদ হয়েছেন এবং জীবন দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের ভিত্তিতে যদি একটি গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা না যায়, তবে তা হবে দুঃখজনক।

সমালোচনা হোক যুক্তিনির্ভর, প্রাধান্য পাক রাষ্ট্রের স্বার্থ

মাহদী আমিন বলেন, সরকার ও রাজনৈতিক দলের সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক। বিরোধী দল মানেই সব বিষয়ে বিরোধিতা করা নয় উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্রের সম্মান ও স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে গিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেখানে তিনি যে সম্মাননা পেয়েছেন, তা শুধু বিএনপির নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের সম্মান বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সব রাজনৈতিক দলকে পারস্পরিক সম্মান ও সৌজন্য বজায় রেখে গঠনমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা করার আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, অযথা বিতর্ক, অপপ্রচার ও অশালীন আচরণ পরিহার করে সত্য ও সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে সহাবস্থানের পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

অপপ্রচার মোকাবিলায় তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য, ছবি ও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা নতুন নয়। তবে কোনো তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে তা প্রচার করা হলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সূত্র, আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এবং প্রাসঙ্গিক প্রমাণের ভিত্তিতে তথ্য প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ।

মাহদী আমিনের বক্তব্যের মূল বিষয়ও ছিল রাজনৈতিক বিতর্কে তথ্যের যথার্থতা, দায়িত্বশীল সমালোচনা এবং পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ঘিরে একাধিক ঘটনায় ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য ও প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মাহদী আমিন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অপপ্রচার, বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর আহ্বান, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সত্যনিষ্ঠ তথ্য, যুক্তিনির্ভর সমালোচনা, বাকস্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন