রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬

আমু-শাজাহান খানসহ ‘হেভিওয়েট’ নেতাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই ফরমাল চার্জ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা ফরমাল চার্জ দাখিল করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। দীর্ঘ তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষে কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

রোববার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের তদন্ত শেষে আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন সাবেক এমপি ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের হাতে এসেছে। প্রতিবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও প্রস্তুত করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের অনুমোদন পাওয়ার পরই এসব অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।

প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটরের অনুমতির অপেক্ষা

প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম জানান, তদন্তের পর পাওয়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে ফরমাল চার্জ প্রস্তুতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন চিফ প্রসিকিউটরের অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করা হবে।

তিনি বলেন, চিফ প্রসিকিউটর বর্তমানে ছুটিতে থাকায় অভিযোগ দাখিলের প্রক্রিয়া তাঁর ফেরার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ফিরলে কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে এসব অভিযোগ উপস্থাপন করা হবে।

এর ফলে দীর্ঘ তদন্তের পর মামলাগুলো এখন বিচারিক কার্যক্রমের আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে

প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য ফরমাল চার্জের তালিকায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাবেক নেতা ও মন্ত্রী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

  • আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু;
  • সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান;
  • সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফারুক খান;
  • সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক;
  • সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী;
  • সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

এ ছাড়া আরও কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও এমপির নামও সম্ভাব্য অভিযোগের তালিকায় রয়েছে বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।

তবে কার বিরুদ্ধে কী নির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হচ্ছে, কোন ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এবং অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ধারা কী—এসব বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফরমাল চার্জ দাখিলের পরই স্পষ্ট হবে।

জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে তদন্ত

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের একপর্যায়ে তা তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। পরবর্তীতে এসব ঘটনায় সংঘটিত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়।

এসব মামলায় সাবেক সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এর আগে বিভিন্ন মামলায় তদন্তের অগ্রগতি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের কথা জানানো হয়েছে।

বর্তমান পর্যায়ে আমু, শাজাহান খান, ফারুক খান, আবদুর রাজ্জাক, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও দীপু মনিসহ কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রস্তুতের তথ্য সামনে এলো।

ফরমাল চার্জ দাখিলের পর কী হবে?

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলায় ফরমাল চার্জ দাখিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক ধাপ। প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ট্রাইব্যুনাল তা পর্যালোচনা করবে। অভিযোগ আমলে নেওয়া হলে মামলাটি পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে এগোবে।

এরপর আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করা হবে। অর্থাৎ ফরমাল চার্জ প্রস্তুত বা দাখিল হওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। অপরাধের অভিযোগ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হতে হবে।

কারাগারে রয়েছেন অভিযুক্তরা

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ফরমাল চার্জের তালিকায় থাকা বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও নেতা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কারাগারে থাকা এসব রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে, তা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর জানা যাবে। একই সঙ্গে আসামিপক্ষের বক্তব্যও মামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে গুরুত্ব

আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষস্থানীয় সাবেক নেতা ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে একই সময়ে ফরমাল চার্জ দাখিলের উদ্যোগ রাজনৈতিক ও আইনগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে সাবেক সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার দেশীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রসিকিউশন বলছে, দীর্ঘ তদন্তের পরই এসব অভিযোগ প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন চিফ প্রসিকিউটরের অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করা হবে।

সব মিলিয়ে, আমির হোসেন আমু, শাজাহান খান, ফারুক খান, আবদুর রাজ্জাক, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও দীপু মনিসহ আওয়ামী লীগের একাধিক সাবেক ‘হেভিওয়েট’ নেতার বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিলের প্রস্তুতি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। তবে অভিযোগগুলো এখনো বিচারাধীন; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায়।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন