শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: ইউরোপের জরুরি ডিজেল মজুতে নজর ট্রাম্পের

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে চাপ এবং ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের দেশগুলোকে জরুরি মজুত থেকে ডিজেল বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ওয়াশিংটন ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানাতে পারে।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইউরোপকে তাদের জরুরি মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার অনুরোধ করা হতে পারে।

তবে এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে ইউরোপের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে বলা হয়েছে, বিশেষ করে জার্মানি ও ফ্রান্সকে জরুরি ডিজেল মজুত থেকে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে বলা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত ডিজেল মজুতের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এই দুই দেশের হাতে রয়েছে।

৬ মাসে ১২ কোটি ব্যারেল ছাড়ার অনুরোধ

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আগামী ছয় মাসে প্রায় ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল মজুত থেকে ছাড়ার অনুরোধ করেছে। জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বিশ্ববাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতেই এই উদ্যোগ।

ওয়াশিংটনের চাপের মাত্রাও বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, জার্মানি ও ফ্রান্স পর্যাপ্ত মজুত না ছাড়লে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার পথও বিবেচনা করছে। তবে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর হয়নি।

কেন এত চাপ ডিজেলের বাজারে

ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা—আইইএর সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ডিজেল ও গ্যাসঅয়েলের নিট রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মাত্র এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি পর্যায়ে নেমে আসে। একই সময়ে রাশিয়ার পরিশোধন ও রপ্তানি ব্যবস্থায় বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

এর সঙ্গে নতুন চাপ তৈরি করেছে চীন। রয়টার্স জানিয়েছে, দেশটির পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অভ্যন্তরীণ মজুত সুরক্ষিত রাখতে অক্টোবরে তেলজাত পণ্য রপ্তানি স্থগিত করেছে। ফলে যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই সংকুচিত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চীনের জ্বালানি রপ্তানি স্থগিতের খবর এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি বেড়ে যায়।

ইউরোপের হাতে এখনো বড় মজুত

ইউরোপীয় কমিশন বলছে, বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম অনেক উঁচু এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকুচিত। কমিশনের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউরোপের জরুরি মজুত এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং বড় ধরনের সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

ইইউর নিয়ম অনুযায়ী সদস্যদেশগুলোকে সাধারণত অন্তত ৯০ দিনের নিট আমদানি অথবা ৬১ দিনের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের সমপরিমাণ—যেটি বেশি—তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের জরুরি মজুত রাখতে হয়। আইইএ সদস্যদেশগুলোর ক্ষেত্রেও ন্যূনতম ৯০ দিনের নিট আমদানির সমপরিমাণ তেলের মজুত রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি—‘সমন্বিতভাবে মজুত ছাড়ার সময় এখনই’

মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেছেন, ইউরোপ জরুরি ডিজেল মজুত ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী। তাঁর মতে, কৃষি মৌসুম এবং শীতকালীন হিটিং অয়েলের চাহিদা সামনে রেখে সমন্বিতভাবে ডিজেল মজুত বাজারে ছাড়ার এটিই উপযুক্ত সময়।

অন্যদিকে ইউরোপের সামনে রয়েছে জটিল সমীকরণ। এখন বেশি পরিমাণ কৌশলগত মজুত বাজারে ছাড়লে তা স্বল্পমেয়াদে দাম কমাতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ আরও ব্যাহত হলে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় জরুরি মজুতের পরিমাণ কমে যেতে পারে।

ফলে ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত মজুত ধরে রাখার প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে ইউরোপকে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন সমন্বিত পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন