দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে মাঝ আকাশে ককপিটে সংঘর্ষের পর তৈরি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি। প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকা ফ্লাইটটি হঠাৎ দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। একপর্যায়ে জরুরি সংকেত পাঠিয়ে উড়োজাহাজটি গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইটে এ ঘটনা ঘটে। উড়োজাহাজটিতে ১৭৪ জন ছিলেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত যাত্রীরা নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছিল যাত্রা
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৫ মিনিটে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে উড়োজাহাজটি। বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজটি পরে প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে স্বাভাবিকভাবে সৌদি আরবের আকাশসীমার ওপর দিয়ে এগোচ্ছিল।
৯টা ২১ মিনিটে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য বলছে, দুবাই সময় সকাল ৯টা ২১ মিনিটের দিকে উড়োজাহাজটি আকস্মিকভাবে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। এরপর আবার উচ্চতা বাড়িয়ে ফের দ্রুত নিচে নামে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমানটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় নেমে আসে।
এই সময় ককপিটের ভেতরে দুই পাইলটের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে ফ্লাইদুবাই নিশ্চিত করেছে। তবে কী কারণে সংঘর্ষের সূত্রপাত এবং ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো চলছে।
প্রথমে ৭৭০০, এরপর ৭৫০০ সংকেত
সকাল ৯টা ২৮ মিনিটের দিকে উড়োজাহাজ থেকে ৭৭০০ ট্রান্সপন্ডার কোড পাঠানো হয়, যা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে সাধারণ জরুরি অবস্থার সংকেত।
এর প্রায় ছয় মিনিট পর সংকেত পরিবর্তন করে ৭৫০০ করা হয়। বিমান চলাচলে এই কোড ‘unlawful interference’ বা বেআইনি হস্তক্ষেপ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। পরে আবার ৭৭০০ জরুরি সংকেতে ফিরে আসে বিমানটি।
ফ্লাইটটি এরপর পশ্চিম দিকে মোড় নিয়ে কিছু সময়ের জন্য জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। পরে ঘুরে আবার সৌদি আরবের দিকে যায় এবং তাবুককে জরুরি অবতরণের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেয়।
এক পাইলটকে ছুরিকাঘাতের দাবি
ঘটনার বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ককপিটে একজন পাইলট অপর পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন এবং উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। আহত পাইলটকে ভারতীয় নাগরিক ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তবে এই দাবি এখনো তদন্তের চূড়ান্ত ফল নয়। ফ্লাইদুবাই বলেছে, ককপিটে সংঘর্ষ হয়েছিল—এটি নিশ্চিত; কিন্তু ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অনুমান না করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেনারেল সিভিল এভিয়েশন অথরিটিও ঘটনার নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত বিভিন্ন দিক তদন্ত করছে।
নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে উড়োজাহাজে
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, ওই ফ্লাইটে যাত্রী হিসেবে থাকা তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ক্রুরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এরপর বিমানটিকে তাবুকের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
যাত্রীদের বর্ণনায়ও ককপিটের সামনে যাত্রী ও ক্রুদের জড়ো হওয়া এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা উঠে এসেছে। একজন যাত্রী রয়টার্সকে জানান, প্রথমে ঘটনাটি তাঁর কাছে প্রচণ্ড টার্বুলেন্সের মতো মনে হয়েছিল।
তাবুকে নিরাপদ অবতরণ
সৌদি সময় সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটের দিকে তাবুকের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল জরুরি অবতরণের অনুরোধ পায়। পরে দুবাই সময় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে উড়োজাহাজটি তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
আহত দুই পাইলটকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে যাত্রীদের জন্য বিকল্প উড়োজাহাজের ব্যবস্থা করে ফ্লাইদুবাই এবং তারা তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
ইসরায়েলগামী ফ্লাইট সাময়িক স্থগিত
ঘটনার পর তদন্ত চলাকালে ইসরায়েলে যাওয়া-আসার ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় ফ্লাইদুবাই। সংস্থাটি বলেছে, যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
এখন তদন্তকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন—ককপিটে সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, ৭৫০০ জরুরি সংকেত কেন সক্রিয় করা হয়েছিল এবং উড়োজাহাজটির আকস্মিক উচ্চতা হারানোর পেছনে ঠিক কী ঘটেছিল। এসব প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

