শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বজুড়ে ডিজেল সংকট: মজুত খুলছে ইউরোপ, রপ্তানি বন্ধের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বন্ধের হুমকিতে উদ্বেগ; বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়াতে ইউরোপ ও আইইএর সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা

বিশ্ববাজারে ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট সামাল দিতে জরুরি পদক্ষেপের পথে এগোচ্ছে ইউরোপ। শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো জরুরি বৈঠকে বসেছে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছেড়ে সরবরাহ বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্স ইউরোপের জরুরি মজুত থেকে ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়ার একটি প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) সদস্য দেশগুলোর মজুত থেকে আরও ৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। প্রস্তাবিত ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরুরি মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশের সমান।

এই উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় মিত্রদের কৌশলগত ডিজেল মজুত দ্রুত বাজারে ছাড়তে চাপ দিচ্ছে। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানিকে জরুরি মজুত ব্যবহারের জন্য ওয়াশিংটন চাপ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রপ্তানি বন্ধের কথাও ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র

সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, দেশের বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে ডিজেল রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করার বিষয়টি তার প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে।

তবে এমন সিদ্ধান্তের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারীদের একটি। ফলে দেশটি রপ্তানি সীমিত করলে ইউরোপসহ আমদানিনির্ভর বাজারগুলোতে সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইইউর বাণিজ্যবিষয়ক প্রধান মারোস সেফকোভিচ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করলে ইউরোপের জন্য সেটি অপ্রত্যাশিত হবে এবং ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন।

কেন হঠাৎ এত বড় ডিজেল সংকট

বর্তমান সংকট শুধু অপরিশোধিত তেলের ঘাটতির কারণে তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহব্যবস্থা একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে পড়েছে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, ইউক্রেনের হামলার পর রাশিয়ার শোধনাগার ও জ্বালানি রপ্তানিতে সমস্যা এবং চীন থেকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ থাকার মতো কয়েকটি কারণ একই সময়ে আন্তর্জাতিক ডিজেল বাজারকে চাপে ফেলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল অপরিশোধিত তেলের সংকট নয়; বৈশ্বিক রিফাইনিং বা পরিশোধন সক্ষমতার সংকটও বড় ভূমিকা রাখছে। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ভারী যন্ত্রপাতিতে ব্যাপকভাবে ডিজেল ব্যবহৃত হওয়ায় এর মূল্যবৃদ্ধি দ্রুত অর্থনীতির অন্যান্য খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল ৬.৩৯ ডলার

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় মূল্য ৭০ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি গ্যালন প্রায় ৬ দশমিক ৩৯ ডলারে পৌঁছেছে বলে এএএ মোটর ক্লাবের তথ্য উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পণ্য পরিবহন, কৃষি ও ব্যবসার ব্যয়ে পড়ছে। এর ফলে ভোক্তা পর্যায়েও ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইউরোপীয় অংশীদারদের বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং চলমান সরবরাহ বিঘ্ন মোকাবিলায় অতিরিক্ত জ্বালানি বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, ইউরোপের পাল্টা উদ্বেগ

Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন ফ্রান্স ও জার্মানিকে জরুরি ডিজেল মজুত ব্যবহারের জন্য চাপ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপ সহযোগিতা না করলে যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে—এমন সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

তবে ইউরোপীয় দেশগুলো এমন পদক্ষেপে সতর্ক। কারণ দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে জরুরি মজুতের বড় অংশ এখনই ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে আরও গুরুতর সরবরাহ বিঘ্নের সময় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার বিনিময়ে ওয়াশিংটন যেন একতরফাভাবে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ না করে—সে বিষয়ে নিশ্চয়তা চাইছে বলে Reuters জানিয়েছে।

ফ্রান্স বলছে ‘ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান’

ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিকোলা ফোরিসিয়ের যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এটি তিনি কল্পনা করতে পারছেন না।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ উভয়ের অর্থনীতির জন্য ডিজেল গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই পক্ষকেই সমাধান খুঁজতে হবে। প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর সঙ্গেও সরবরাহের বিকল্প খোঁজা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

জি৭ পর্যায়েও উদ্যোগ

সংকট এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের গণ্ডি ছাড়িয়ে জি৭ পর্যায়েও পৌঁছেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ জ্বালানির মূল্য কমানো এবং অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে জি৭ দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ফ্রান্স বর্তমানে জি৭-এর সভাপতিত্ব করছে এবং এ নিয়ে নেতাদের ভার্চুয়াল বৈঠকের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ইউরোপীয় পর্যায়েও জরুরি জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সম্ভাব্য মজুত ছাড়ার বিষয়ে কারিগরি আলোচনা চলছে।

বাজারে ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া

ইউরোপ কৌশলগত মজুত থেকে ডিজেল ছাড়তে পারে—এমন খবর প্রকাশের পরই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

শুক্রবার ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ ডিজেল বেঞ্চমার্ক গ্যাসঅয়েল ফিউচারের দাম একপর্যায়ে ৪ শতাংশের বেশি কমেছে। নিউইয়র্ক হারবারের ডিজেল ফিউচারও প্রায় ৩ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ আসতে পারে—এই প্রত্যাশাই তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য কমাতে ভূমিকা রাখছে।

তবে জরুরি মজুত ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রধান উৎপাদন ও পরিশোধন অঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে ডিজেল বাজারে চাপ আবারও বাড়তে পারে।

বর্তমান সংকট তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের জ্বালানি সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই। পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি ডিজেলের মূল্য দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন