নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত ও নির্বাহী পরিচালককে হুমকির অভিযোগ; একই ফ্লাইটের লাগেজ বিলম্বে বিমানের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মদিনাফেরত যাত্রীদের লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম সজীব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি করেন। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মামলাটি দণ্ডবিধির ১৮৬, ১৮৯, ২৯৪, ৩২৩, ৩৫২, ৩৫৩, ৫০৪ ও ৫০৬ ধারায় করা হয়েছে।
কী ঘটেছিল বিমানবন্দরে
মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল প্রায় ১০টা ৪০ মিনিটে মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীরা ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় অবস্থান করছিলেন। বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাপের মধ্যে ট্রলির সংকট দেখা দেয় এবং লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটটি সকাল ৯টা ১০ মিনিটে ঢাকায় অবতরণ করে। ওই ফ্লাইটের যাত্রীদের একটি অংশকে জমজমের পানিসহ লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। চারজন সংসদ সদস্য এ নিয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগও দেন।
নির্বাহী পরিচালককে হুমকির অভিযোগ
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে গেলে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, একপর্যায়ে তিনি নির্বাহী পরিচালকের দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে গালিগালাজ করেন এবং মারধর ও বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীকে নিয়েও তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রকাশিত ভিডিও নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে উত্তপ্তভাবে কথা বলতে দেখা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে।
এজাহারে বলা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি বিমানবন্দরের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। দায়িত্বরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও ধারণ করতে নিষেধ করেন।
এতে আখতারুজ্জামান ক্ষুব্ধ হয়ে ওই কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ফেলে দেন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন প্রতিনিধির সঙ্গেও মারমুখী আচরণ করেন।
লাগেজ বিলম্বের ঘটনায় বিমানের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
ঘটনার আরেকটি দিক হলো যাত্রীসেবায় ত্রুটির অভিযোগ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রাথমিক অনুসন্ধানে কনটেইনার আনলোডিংয়ে সমস্যা ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয় উঠে আসে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এরপর ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান এবং ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বিমানের সংরক্ষিত মজুত থেকে জমজমের পানি সরবরাহ করা হয় এবং পরে অন্য একটি কনটেইনারে থাকা বাকি পানি শনাক্ত করে যাত্রীদের দেওয়া হয়।
ফলে ঘটনাটিতে দুটি পৃথক বিষয় সামনে এসেছে—একদিকে যাত্রীদের লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে দীর্ঘ বিলম্ব এবং বিমান কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা; অন্যদিকে সেই পরিস্থিতির মধ্যে আখতারুজ্জামানের আচরণ নিয়ে বিমানবন্দর নিরাপত্তা কর্মকর্তার করা ফৌজদারি মামলা।
সিসিটিভি ও সাক্ষ্য যাচাই করবে পুলিশ
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের তদন্তে বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত সংগ্রহ করা হবে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিমানবন্দর থানার ওসির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য গ্রেপ্তারসহ পরবর্তী পদক্ষেপ তদন্তের ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।

